শেকড়ের স্মৃতি // ছেলেবেলা - ৩৩ // বন্য মাধব

shrutisahitya.com











স্যায়না প্রথম সন্তান মারা গেলে মায়ের হাল কী হয় বড় জ্যেঠিমাকে দেখে আমরা সেটা যেমন বেশ বুঝেছিলাম, তেমনি বুঝেছিলাম সরলাদিকে দেখে। বড় মামার প্রথম পক্ষের তিন সন্তানের মধ্যে সরলাদি ছোট এবং একমাত্র মেয়ে। মামারবাড়ির কাছেই, ঊষপাড়াতে দিদির বিয়ে হয়েছিল। জামাইবাবু প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক।

বড় ছুটিছাটায় সপরিবারে দিদিরা আমাদের বাড়িতে আসতো। মা মরা ভাইঝিকে তার সেজপিসি একটু বেশিই আদর যত্ন করতো। স্যায়না ছেলেকে হারিয়ে দিদি যখন আমাদের বাড়িতে সেবার এল, তখন তার পাগলপ্রায় অবস্থা। সেজপিসির স্নেহের প্রলেপ সে সময় খুব কাজে দিয়েছিল।

পিসিও যে ভুক্তভুগি, প্রথম দুই মেয়েকে হারানোর শোক তাকেও যে সামলাতে হয়েছিল। সময়ে অসময়ে মাকে দেখেছি মাকে চোখের জল ফেলতে। জানতে চাইলে " পেটেধরা কালশত্তুর "দের কথা বলতো মা। সুবলদার শোকও মা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল বলে মনে হয় নি। দাদার জন্যেও মাকে কাঁদতে দেখেছি। বাবার অকাল মৃত্যু মাকে একেবারে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিল। মা আর সেখান থেকে আমৃত্যু বেরতে পারে নি।

মাকে শোক মুক্ত করার ক্ষেত্রে আমার ভূমিকাও ছোটবেলা থেকেই যথাযথ ছিল না। নিজের শিকড় থেকে বাধ্যতামূলক উৎখাত হবার পর জীবন বেশ এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল মারও, আমারও। আর গোছাতে পারি নি, মাও পারে নি। শেষ বয়সে মা আরও একটি শোক পেয়ে গিয়েছিল, আমার আজন্ম খেলার সাথি, আমার পিঠোপিঠি দাদা, স্কুল শিক্ষক বলাইদার মৃত্যুতে।

যদিও অধিকাংশ সময় মা তখন এসব কিছুর উর্দ্ধে থাকতো। ছেলেদের ছাড়া কারও সঙ্গে তেমন একটা কথাবার্তাও বলতো না। নিজের জগৎটাকে একেবারে ছোট্ট করে নিয়েছিল মা। সে জগতে নাতি নাতনিরাও প্রবেশাধিকার পায় নি। ২ এপ্রিল, ১৯৭৮ থেকে ২৬ জানুয়ারি, ২০১৬ এই দীর্ঘ বৈধব্য জীবন মা কাটিয়েছিলেন শুধু ছেলেদের নিয়ে।

( চলবে)

Post a Comment

0 Comments