মুয়াদেবের শাপ // সুব্রত মজুমদার // ভাগ - ৫

shrutisahitya.com

২২শে এপ্রিল 


ব্রেকফাস্ট করেই গাড়িতে উঠে পড়লাম। আমার সাথে দেবলীনা ও দুজন কনস্টেবল। গাড়ি ক্রমশ শহর ছাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে। আস্তে আস্তে ইট কাঠ আর কংক্রিটের জঞ্জাল পেরিয়ে গাড়ি ঢুকে পড়েছে সবুজের রাজত্বে। চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। সকালবেলা বলে গরমের আঁচ নেই। বরং ঠান্ডা বাতাস শরীরকে জুড়িয়ে দিচ্ছে। 

.

দেবলীনা কলকাতার মেয়ে। সে তাকিয়ে আছে সবুজের দিকে সন্মোহনগ্রস্হ শিকারের মতো। কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই তার। কিছুটা যাবার পর একটা গ্রাম। গ্রামটা ছোট। তবে বাসের রাস্তার ধারে হওয়ায় দু'একটা দোকানপত্র আছে। দেবলীনা বলল, - "ড্রাইভার, গাড়ি থামও। ও-ওই চায়ের দোকানটার সামনে। হ্যাঁ হ্যাঁ এখানেই।" 

.

গাড়ি থামল। দেবলীনা সবার জন্য চা আর বিস্কুটের অর্ডার করল। দু' তিনটে বয়ামের ভিতর বিভিন্ন ফ্লেভার ও সাইজের বিস্কুট। যে যার পছন্দমতো নিল। চা খেতে খেতে নজরে পড়ল পাশে একটা বিশাল বটগাছ। সেই বটগাছের নিচে এক সাধুবাবা বসে। তাকে একটা দশটাকার নোট দিতে গেলাম। তিনি নিলেন না। 

- বাবা, ঘর ছেড়েছি পরিজন ছেড়েছি তা কি এই টাকার জন্যে। মায়ের কৃপায়  দুবেলা অন্নের যোগান হয়েই যায়। আর কি চাই বাবু ! 

.


আমি বললাম, - "আপনার হাতে তো একতারা দেখছি। একটা গান শোনান না।" সাধুবাবা গান ধরলেন। 

                        আয় মা এসে বস মা কোলে যতন করে সাজিয়ে দি

                        এলো চুল পড়েছে মুখে , কি অভিমান জমলে বুকে ?

                        শুকালো মা দুইগালে তোর অশ্রুজলের বারিধী।

                        বুঝাই তোরে কেমন করি তোর লাগি মা ঘরে ফিরি

                    (আমি)  তোর নয়নে জগৎ হেরি , আনন্দহাট বসিয়ে দি।

                       কে বলে তুই পাগলী মেয়ে ওরাই পাগল দেখুক গিয়ে ;

                       নাই পরেছিস বসন গায়ে,  তাতে বা যায় আসে কি  ?

                        সুব্রতের কঠোর হিয়া এলো কণ্যারুপা হরজায়া

                       দিলো ব্যথা না চিনিয়া,  এখন উথলিছে স্নেহনদী।।

.

গান শেষ হতেই দেখি আমার পেছনে দেবলীনা দাঁড়িয়ে। সাধুবাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসি। আবার গাড়ি চলতে শুরু করে। পাকা রাস্তা পেরিয়ে গাড়ি উঠেছে মোড়াম বিছানো লাল ধুলোর সরানে। চারপাশের পরিবেশটা দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। এখন দু'পাশে শুধু শাল আর মহুলের জঙ্গল। রাস্তা নদীর পাড় ধরতেই দেখি নদীর পাড়বরাবর শর আর কাশের ঝোঁপ সার দিয়ে চলেছে গাড়ির সাথে সাথে। আর সেই শরবন ভেদকরে নদীর কালচে নীল জল দেখা যাচ্ছে। নদীর ধার বরাবর চলার পর এল একটা আদিবাসী গ্রাম। সেটা পার হওয়ার পর এল নদীটার টার্নিং। একটা ভাঁসা ব্রিজ রয়েছে নদীর উপর যেটা বন্যার সময় ডুবে যায়। ব্রিজটি পার হয়ে নদীর অন্যদিকে পৌঁছলাম। 

.

আরো ঘন্টাদুয়েক চলার পর পৌঁছলাম বটপাহাড়ীতে। একটা গভর্নমেন্ট গেস্ট হাউস, বেশ বড়সড়। জনাদশেক প্যারামিলিটারি পাহারায় আছে। আমরা জিনিসপত্র রেখে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। দেবলীনা একটা ম্যাপ এনে সামনে রাখলো। 

.


- "এখন এই ম্যাপই আমাদের টিলার দিকে যেতে সাহায্য করবে।" দেবলীনা বলল। 

- হ্যাঁ, আগেরবার আমি ওখানে গেছি কিন্তু অন্য রাস্তায়। আর আমার পথপ্রদর্শক ছিল হিজু। 

- কাল আমাদের সাথে  নির্মল বাবু যোগদেবেন। উনি লোকাল থানায় চারবছর আছেন। অভিজ্ঞতাও অনেক। 

- দেখ দেবলীনা আমার মনে হয় শুধু নিরাপত্তা নয় টিলার ভেতরের যে টক্সিক ওয়েদার তা থেকে সাবধান থাকতে হবে। 

- তার কিছু ব্যবস্থা করেছ কি ? 


.

- হ্যাঁ, প্রেমা নির্মলবাবুর হাত দিয়ে পর্যাপ্ত গ্যাসমাস্ক ও অক্সিজেন পাঠিয়ে দেবে বলেছে। সমস্ত সেলফোনের ফুলচার্জ করে নিতে হবে। জিপিএস সবসময় অন থাকবে। 

- কিন্তু পটলের দাঁত নীল হয়ে যাবার কি কারন থাকতে পারে ? আর সেযাত্রা তোমরা বেঁচে গিয়েছ বলে ভেবো না যে ঐ টক্সিক ওয়েদার হতে সহজে রক্ষা পাওয়া যাবে। 

- আরে না, আমি তা বলছি না। তবে থেমে থাকলে তো চলবে না। 

.


                               বিকালে আমি আর দেবলীনা পাশের গ্রামে গেলাম। গ্রামটা ছোট কিন্তু প্রাণবন্ত। গ্রামের স্কুলের মাষ্টারমশায়ের বাড়িতে চা পানের নিমন্ত্রণ এল। মাষ্টারমশাই খুব সহজ ও সরল স্বভাবের। বাড়িতে যেতেই বেতের মোড়া পেতে বসতে দিলেন। মাষ্টারমশায়ের স্ত্রী থালায় করে পাঁপড়ভাজা ও চিনামাটির কাপে টাটকা দুধের চা এনেদিলেন। চা খেতে খেতে আমাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য তাকে বললাম। কথাপ্রসঙ্গে তিনি জানালেন যে দীনেশকে তিনি চেনেন। আর আমার কথাও শুনেছেন। 


.

মাষ্টারমশাই শোনালেন এক অদ্ভুত গল্প। দীনেশের পরিবার বংশপরম্পরায় মুয়াদেবের উপাসক। মুয়াদেবের আশীর্বাদ থাকলে খুব সহজেই বড়লোক হওয়া যায়। কিন্তু মুয়াদেবের উপাসনা অতো সহজ নয়। বছরের বিশেষ একটি দিনে নরবলি দিতে হয় মুয়াদেবের থানে। 

- "এই একবিংশ শতকেও মধ্যযুগীয় বর্বরতা !" আমি ক্ষোভ প্রকাশ করি। 

- "আপনি যেটাকে বর্বরতা বলছেন সেটা ওদের কাল্ট।" মাষ্টারমশাই আমার দিকে তাকিয়ে হাঁসেন। 

-"মাষ্টারমশাই, কোনোভাবে পটলকে মুয়াদেবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়নি তো ?" দেবলীনা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলে ওঠে। 


.

- দিদিমণি, বিক্রমবাবু যা বর্ণনা দিলেন তাতে এই ঘটনা Human sacrifice বলেই মনে হচ্ছে। 

দেবলীনা চমকে ওঠে। তার হাত হতে পাঁপড়ের টুকরোটা পড়ে যায়। " মানে ! লোকাল প্রশাসন করে কি ? এইসব অপরাধীদের ধরে ধরে একাউন্টার করা উচিত।" 

- "প্রমাণ কই যে এরা অপরাধী ? তাছাড়া এদের ক্ষমতা আপনি জানেন না দিদিমণি। এরা সংখ্যায় অনেক।" মাষ্টারমশাই কথাগুলো বলে দেবলীনার দিকে বিচিত্র দৃষ্টিতে তাকালেন। এখন আর মানুষটাকে সহজ সরল মনে হচ্ছে না। দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক ক্রূরতা। 

.


আমি প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে পরিবেশটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করি। খেজুরে গল্প জুড়ে দিই। মাষ্টারমশাই আবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠেন। জানতে পারি মাষ্টারমশায়ের বাড়ি এখানে নয়। চাকরির সূত্রে এখানে আসা। তারপর এখানকার একটি মেয়েকে বিয়ে করে থিতু হয়ে যান। স্থানীয় লোকবিশ্বাস আর সংস্কৃতির উপর অগাধ শ্রদ্ধা মাষ্টারমশায়ের। 


.......... চলবে   

Post a Comment

0 Comments