ভুতুড়ে আরোহী // সুব্রত মজুমদার

132




               আমার বন্ধু পলাশ থাকে ঝাড়খণ্ডের একটা ছোট্ট গ্রামে। জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার চাকরির সুবাদে বহুদিন ধরেই ওখানে পোষ্টিং ওর।  ও প্রায়ই আমাকে ওর ওখানে যাবার কথা বলে, কিন্তু আমার কি সে জো আছে ! আমার বেতন কম বেত বেশি। তার উপর বৌয়ের খিটখিট। কোথাও যে দু'একদিন বেড়িয়ে আসব তার উপায় আমার নেই।



প্রবাদে আছে যে গাধারও সুসময় আসে। অবশেষে আমারও সুসময় এলো। গ্রীষ্মের ছুটি পড়েছে, বৌকে বললাম - "চলো কোথাও ঘুরতে যাই।" বৌ আহ্লাদে গদগদ হয়ে আমার জন্য চা বানাতে গেল।  সাতচল্লিশ বার অনুরোধের পর আটচল্লিশতম বার অনুরোধ না করে যে চা আমি দোকানে গিয়ে খাই সেই চা স্বয়ং গিন্নী বানাচ্ছে, তাও বিনা অনুরোধে। ভাবা যায় !



কিন্তু বিধি বাম। বৌ রান্নাঘরে যাবার মাত্রই মোবাইলটা বেজে উঠল। ফোন ধরতেই ওপার হতে শাশুড়ির আর্তস্বর। কোমরের ব্যাথায় তিনি শয্যাশায়ী, তার কন্যা যেন এক্ষুনি পিত্রালয়ে গমন করে। আমি সে খবর রান্নাঘরে গিয়ে পীড়িতার কন্যাকে জানালাম। তিনি তখন ফ্রিজ হত দুধ বের করছিলেন। শশব্যস্ত হয়ে আমার হাতে দুধের পাত্র ধরিয়ে দিয়ে ঘরের ভেতরে গেলেন।


বৌ বাপের বাড়ি যেতেই পরদিনই আমি ঘরে তালা মেরে রওনা হলাম বন্ধুর বাড়ির উদ্দেশ্যে। বাসে যাওয়া যায়, কিন্তু দু'তিনটে বাস বদল করতে হবে। তাছাড়া রাস্তার অবস্থাও ভালো নয়। তাই ট্রেনেই রওনা হলাম।



              ট্রেন থেকে যখন নামলাম তখন বিকেল হয়ে এসেছে। স্টেশনটি ছোট, সারা দিনে গোটাচারেক ট্রেন দাঁড়ায় এখানে। স্টেশন থেকে বেরিয়েই একটা চায়ের দোকান,দোকানে লোকজন তেমন নেই। দোকানের সামনে একখানা মাত্র টোটো দাঁড়িয়ে। চারদিকে আর কোন যানবাহন দেখতে পেলাম না। পলাশ বলেছিল যে স্টেশনে নেমে অটো টোটো বা রিক্সার কোনো একটা ধরে মড়াংডিহিতে চলে আসতে। কিন্তু এখানে তো একটা মাত্র টোটো, তাও আবার চালকের দেখা নেই। এসব কথা ভাবছি এমন সময় পাশের ভাঁটঝোঁপ হতে একটা লম্বা সিরিঙ্গে মতো লোক বেরিয়ে এল।


" কোথায় যাবেন বাবু ?" একগাল হেঁসে লোকটা প্রশ্ন করল।  প্রশ্নেই বুঝলাম লোকটা টোটোটার চালক।



"মড়াংডিহি। কত নেবে ?"


লোকটা মুখের হাঁসি অম্লান রেখে বলল, "যেতে তো সবাইকেই হয় বাবু, কেউ মড়াংডিহি তো কেউ মরনের ওপারে। তা যা মন হয় দেবেন বাবু।"



লোকটার জ্ঞানগম্ভীর কথায় বেশ বিরক্ত হলাম। ব্যাগপত্র নিয়ে চড়ে বসলাম টোটোতে। টোটো চলতে শুরু করল। দিনের আলো কমে আসছে। চারপাশের গাছপালাগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের লোক রাস্তার ধারে ধারে দাঁড়িয়ে বা বসে ঝিমোচ্ছে। ঝিল্লির একটানা আওয়াজ এই গাছমছমে পরিবেশকে আরো ভৌতিক করে তুলেছে। কিছুটা যাওয়ার পর টোটোটা দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখি সামনে দুজন লোক। অন্ধকারে চেহারা ভালো বোঝা যায় না, তবে মনে হল একজন নারী ও আরেকজন পুরুষ।




          দুজনেই আমার সামনের সিটে আমার মুখোমুখি এসে বসল। স্ত্রী লোকটি এতক্ষণে মুখ খুলল। "এই ঘাটের মড়া, ঠিক করে চালাবি। আগের বার দিয়েছিলি তো উল্টে ! অনামুখো তোর জন্যে আমার ঘাড়টা ভাঙল।"


আমি কৌতুহলী হয়ে ভদ্রমহিলার ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, " ঘাড় ভেঙেছিল মানে ? ঘাড় ভাঙ্গার পরও...."


ওপাশ থেকে তীব্র ভাষায় গালাগালি বর্ষিত হতে থাকল। "তোর কি রে খালভরা !  তুই ডাক্তার ! থাকতো মেতন দাদা বুঝতিস কত ধানে কত চাল। "




এবার পাশের লোকটি গর্জে উঠল," আবার, আবার ওই হতচ্ছাড়ার নাম নিলি। মরেও শান্তি নেই কপালে। হে ভগবান এই বদ মেয়েছেলেটাকে আর কতদিন সহ্য করব !"


দুজনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বেঁধে গেল। এর মধ্যেই ড্রাইভার আবার টোটো থামাল। এবার টোটোটা থামল রাস্তার ধারে একটা প্রতীক্ষালয়ের সামনে। একটা মোটাসোটা লুঙ্গিপরা লোক আমার পাশেই এসে বসল। তার হাতের ঝুড়িতে কতগুলো মুরগি কঁক কঁক করে চিৎকার করছে।




লোকটা ঝুড়িতে হাত বুলিয়ে মুরগিগুলোর উদ্দেশ্যে বলল, " থাম, থাম বাপ ! আর একটুখানি, তারপর তোদেরও মুক্তি আর আমারও মুক্তি।"  দু'একটা মুরগি নিষেধ অমান্য করে ঝুড়ির বাইরে আসতে চাইছে। সবিস্ময়ে দেখলাম কোন মুরগিরই চোখ খোলা নেই। কাটার পর যেমন চোখটা বন্ধ হয়ে যায় ঠিক সেরকমই। আমার হৃৎপিণ্ড দিয়ে সহসা একঝলক রক্ত বয়ে গেল।


       ইতিমধ্যেই ড্রাইভার পেছনফিরে তাকাল। তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে টোটো চালাতে চালাতে বলল, " কি জামশেদ চাচা ধান্দাপানি কেমন হল ? আমার জন্যে একটা হাঁস আনতে বলেছিলাম, এনেছেন ?"




  জামশেদ চাচা একটা মুরগিকে জোর করে ঝুড়িতে চালান করতে করতে বলল, " আজ পাইনি রে বাপ। পরের দিন আবার খোঁজ করব। এখন ঝিমেনির সময় বাপ, হাঁস মুরগি কেউ কিনতে চায় না। ওই খোরাকিটা উঠে যায়। "




এবার আমার চোখ সামনের সিটের দিকে গেল। সেই ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা লোলুপ দৃষ্টিতে মুরগির খাঁচার দিকে চেয়ে আছে। হঠাৎ ভদ্রমহিলাটির একটা হাত লম্বা হয়ে মুরগির ঝুড়িতে ঢুকে গেল। আমি আর দম ফেলতে পারছি না। এমন দৃশ্য দেখে নার্ভ স্টেডি রাখাটা খুব সহজ কাজ নয়। কিন্তু একটা বিকট চিৎকারে আমার সম্বিত ফিরে এল। দেখি জামশেদ চাচা ভদ্রমহিলার হাতটাকে চেপে ধরেছেন।




" আরে চোরণী কিছু শরম হায়া তো কর। খুব পিয়াস লেগেছে তোর, যা জঙ্গলে বাঘ হাতি ধরে পিয়াস মেটা।" জামশেদ চাচার হুঙ্কারে নিস্তবদ্ধতা ভেঙে খান খান হয়ে গেল। এদিকে ঐ ভদ্রমহিলাও কম যান না। তার চিলচিৎকারও শুরু হল।




   " এই বুড়ো, কি ভাবিস আমাকে ! এই শশীবালাকে চেনে না এমন লোক এ তল্লাটে নেই। ব্যাটা মামদো মরেও তোর জিনিসপত্রের উপর টান কমেনি। তোর মুরগির ঝুড়িতে আগুন লাগুক।"


এইসব ঝগড়াঝাটি যখন চলছে ঠিক তখনই ড্রাইভারের পাশের সিট হতে একজন বলে উঠল, "সংস্কার বলে কিচ্ছু নেই তোমাদের। যখন দেখ ঝগড়া আর ঝগড়া। মাঝে মাঝে ভাবি এ গাড়িতে আর উঠব না, কিন্তু উপায় কি ! "




" উপায় কি মানে ! " আমি সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলাম। এই লোকটি যে কখন টোটোয় উঠেছে তা বুঝে উঠতে পারিনি। লোকটা আমার প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে বলল, "আচ্ছা ত্যাঁদড় তো ছোকরা, আমার মুখে মুখে প্রশ্ন কর ! বেঁচে থাকতে এই শ্রীপতি মাষ্টারের মুখের উপর কথা বলার সাহস হয়নি। জামশেদজী, আপনার মুরগিগুলো কিন্তু ভারি বেয়াদব। সেদিন ব্রিজ হতে আমার মুখের উপর পড়েছিল। কি বিশ্রী গন্ধ ! এইদেখো...।"     এই বলে মাষ্টারমশাই তার মুণ্ডুটাকে ধড় হতে খুলে জামশেদ চাচার নাকের কাছে ধরল।





      ...... চলবে

Post a Comment

0 Comments