একটা আলাদা প্রেমের গল্প // অভ্র ঘোষাল







20.


--- তুমি আমার কথাটা একটু ভেবে দেখো ঋষি, please... তুমি কি জানো না তোমাকে আমি কতোটা ভালোবাসি ? নাকি বুঝেও অবুঝ হয়ে থাকছো ?


--- দেখো সুজাতা, আমার একটু সময় লাগবে। তুমি তো জানো আমার এখন কী পরিস্থিতি ! কতোটা পরিমাণ ব‌্যস্ততার মধ‌্য দিয়ে আমাকে যেতে হচ্ছে!


--- ব‌্যস্ততা? তোমার ব‌্যস্ততা তো কেবল ছবি আর ছবি আর ছবি ! Paintings !


আমি তো সেই শুরুর থেকেই তোমার কাছে একটা গৌণ বস্তু।


--- ওটা আমার পেশা সুজাতা ! পেশা এবং নেশা দুটোই ! আর তুমি যে secondary object, সেটা তো আমি একবারও বলিনি । না হয়, একটু ব‌্যস্তই থাকছি কয়েকটা exhibition নিয়ে, তাই বলে কি আমি বলেছি যে তোমাকে আমি ভালোবাসি না?


( সুজাতা chair-এ বসে পড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে )


--- একটা কথা বলবো তোমাকে ?


--- বলো ( Cigarette-টা জ্বালিয়ে  ধোঁয়া ছাড়লো ঋষি )।


--- জানো তো, অনেক মেয়ে ছিনিমিনি খেলতে ভালোবাসে। জটিলতাতেই তাদের সুখ। কারণ, অনেক সমস‌্যা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে---এ-কথা ভেবে তারা নিজেকে বাহবা দিতে পারে। কিংবা, ছাড়াতে পার না-পারলে --- বিষম মুশকিলে পড়ে অন‌্য লোকের বাহবা পেতে পারে। আমি সে-রকম নই। আমি প্রাঞ্জল। কম সমস‌্যা তো আর face করিনি বা করছি না জীবনে!


--- সুজাতা I totally can get your words ! আমার নিজের কি খারাপ লাগে না বলো ? কিন্তু আমাকে একটু তো সময় দেবে !


--- সময়? আর কতো সময় তুমি নেবে ঋষি? সময় নামক বস্তুটার কি কোনও মানে তোমার কাছে আছে? সাত বছর ধরে আমাদের চেনাশোনা ; এই দীর্ঘ সময়ে একদিনের জন‌্যেও আমি কিন্তু তোমাকে অযথা disturb করিনি, তোমার কাছে তেমন কোনও আবদারও করিনি...


কিন্তু এই করে করে তো সাতটা বছর কেটেই গেলো। এবার at least একটু থিতু হও না !


--- দেখো সুজাতা, তুমি জানো আমি কতোটা ছন্নছাড়া আর এলোমেলো গোছের একটা ছেলে !


আমার পক্ষে নিজেকে গোছানো এতোটা সহজ নয়। আমার ঘরের অবস্থাটা দেখেছো ? দেওয়ালের গায়ে ঠেশান দিয়ে রাখা আছে শেষ-করা, শেষ-না-করা, মাত্র-আরম্ভ-করা ছবি ; মেঝেতে স্তূপীকৃত বই, পত্রিকা ; বইয়ের মলাটে cigarette-এর পোড়া দাগ, দেওয়ালের গায়ে ধোপার হিসেব pencil-এ লেখা। এই সব কিছুর মধ‌্য দিয়ে নিশ্চয়ই যে কেউ বুঝতে পারবে আমি কেমন অগোছালো একজন ! আর ঠিক আমার জীবনটাও এরকম, তুমিই তো ভালো মতোন জানো সুজাতা।




--- দেখো ঋষি, তুমি আমাকে যথেষ্ট ভালোবাসোনি, কিন্তু সেটা তোমার দোষ নয়। আমিও তো ইচ্ছে করে কখনও কোনও ঘোর তৈরি করিনি। এর চেয়ে বেশি ভালোবাসার ক্ষমতা তোমার ছিলো না। তুমি artist ; তোমার চোখে Michelangelo-র মতো লালচে ছিটে ; কোনও একদিন তুমি গগনেন্দ্রনাথের তুল‌্য শিল্পী হবে, কিন্তু সেই উদ্দেশ‌্য সাধনের জন‌্য তো তোমাকে-আমাকে দুজনকেই দাম দিতে হচ্ছে।


--- তোমায় দাম দিতে হচ্ছে মানে? ( Cigarette-এ শেষ টানটা দিয়ে ash-tray-তে ফেলে ঋষি )

--- সেটাই বলতে এসেছি আজকে। জানি, এই দুপুরের দিকটা তুমি তোমার artistic কাজকর্ম করো, কিন্তু এখন না এসে কোনও উপায়ও ছিলো না আমার। আজকে সন্ধ‌্যায় বাড়িতে কিছু লোক আসবেন, তাই...


 --- আরে তাতে কী হয়েছে ? আমারও একটু একঘেঁয়েই লাগছে কয়েক দিন ধরে। পরশু একটা exhibition আছে Cima-তে। সেটা নিয়েই একটু ব‌্যস্ত থাকতে হচ্ছে । কিন্তু কারা আসবেন? সেটা তো বললে না ! ( সুজাতা মাথা নীচু করে রইলো। )কী গো? এই  ! এই সুজাতা!

( ঋষির খেয়াল হলো সুজাতা ফোঁপাচ্ছে ।  ও মাথাটা একটু তুলতেই ঋষি দেখলো, সুজাতার চোখ আর্দ্র হয়ে উঠেছে, নাক লাল হয়ে গিয়েছে। ঋষি ওর chair ছেড়ে উঠে sofa-র উপরে সুজাতার পাশে গিয়ে বসলো।

--- এই, কাঁদছো কেন? এই পাগলী!  কী হলো? এই দেখো মেয়ের কান্ড !

( সুজাতা কিছুক্ষণ ঋষির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ জড়িয়ে ধরে ওকে। ওর কাঁধে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকে। )

--- আমার বাড়িতে আমার বিয়ের কথা চলছে ঋষি। আজকে সন্ধ‌্যায় যাদের আসার কথা বললাম, তারা আমাকে দেখতে আসছে ! আমার খুব অসহায় লাগছে নিজেকে ঋষি। Please help me ! আমি যে তোমাকেই ভালোবেসেছি ঋষি। ওই জায়গায় তো আর কাউকে বসাতে পারবো না আমি!

( ঋষি দু-হাত দিয়ে সুজাতাকে মুখের সামনে আনে। একটু হাসি হাসি মুখ ঋষি-র।  )

--- তাই ? তুমি তাহলে বাড়িতে বলোনি কেন এখনও আমাদের ব‌্যাপারে? আরে বাবা, আজকে তো তোমাকে দেখতেই আসছে তারা ! আজই তো আর বিয়ে হচ্ছে না তোমার!

( সুজাতা একটু গাল ফুলিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলে )

--- মজা করছো তুমি ? আমাদের ব‌্যাপারে বাড়িতে কী বলবো গো? তুমি একটু serious হলে তবেই তো বলবো ! তুমি একটু গা করলে তো বলবো ! তোমারই তো আমার প্রতি কোনও interest নেই বলে মনে হয় আমার।

--- অভিমান হয়েছে madam ? কিন্তু আমাকে একটা কথা বলো তো। আমার ভালোবাসার কোনও বৈশিষ্ট‌্য তোমার চোখে পড়ে না?

--- হুঁ, খুব বুঝি ! তোমার ভালোবাসাটা হলো পোশাকি কাপড়ের মতো। রবিবারের পরে বাকি সপ্তাহের মতো iron করে wardrobe-এ তুলে রাখার জিনিস। সেখানে ধুলো অবশ‌্য লাগে না, কিন্তু হাওয়াও লাগে না। হাওয়া---জীবন ধারণের পক্ষে যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়। তোমার মতো যারা artist নয়, তাদের ওতে মন ভরে না। তোমার মধ‌্যে কোনও প্রবল আবেগ নেই ঋষি। সংযম---লোকে বলবে। কিন্তু সংযম না দৌর্বল‌্য কে জানে !

( আহ্লাদিত হয়ে ওঠে ঋষি। সুজাতার দুই কাঁধে দুটো হাত রাখে ও এবং হালকা একটু ঝাঁকুনি দেয়।  )

--- Bravo ! Bravo ! Bravo ! Just outstanding ! দারুণ বললে তো কথাগুলো! সত‌্যিই, আমি নিজেও নিজেকে এতোটা বুঝিনি ! তাহলে বলতে হবে, সাহিত‌্যের ছাত্রীকে ভালোবেসে ভালোই করেছি ! তবে, এই যে পাত্রপক্ষ আজ দেখতে আসছে সে কি Doctor না Engineer ?

--- খুব মজা, তাই না ? শুনেছি Engineer, যাও, এবার শান্তি ?

( এবার sofa থেকে উঠে পশ্চিমের জানলাটার দিকে এগিয়ে দাঁড়ায় ঋষি। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ, শান্ত। Ceiling fan-এর ঘূর্ণীর শব্দ ছাড়া আর বাইরের কোনও কিছুর আওয়াজ আসছে না তেতলার এই ঘরটায় । তারপর ঘুরে দাঁড়ালো ও। )

--- আমাকে কি সত‌্যিই ভালোবাসা যায় সুজাতা? আমাকে ভালোবেসে কি তোমার মধ‌্যে ভালোবাসার কোনও অপচয় হচ্ছে না? এই অপচয় তো সহ‌্য করা অসম্ভব। আমার মন কখনও প্রেমে উদভ্রান্ত হয় না।  যাদের হয়, তারা বোধ করি সত‌্যই ভালোবাসতে জানে! সত‌্যিই হয়তো আমাকে তুমি আরও ভালোবাসতে পারতে, কিন্তু আমিই হয়তো দিতে পারলাম না কোনও দিন। তবে ভালোবাসা বলতে আমি যা বুঝি তা হলো, এই ব‌্যাপারটা রুগ্ন শিশুর মতো করুণ অসহায় ;--- আবার, বিশাল সেনাবাহিনীর মতো ক্ষমতায় অপরাজেয়।

( সুজাতা উঠে দাঁড়িয়ে আবার জাপটে ধরে ঋষি-কে। কান্নার মাত্রা আরও বেড়ে যায় ওর। )

--- আমি কি তা বলেছি পাগল? আমি কি একটু অভিমানও করতে পারি না?

--- না না, অবশ‌্যই পারো madam! আমি তো আমার দোষগুলো বললাম মাত্র। আমার মনে পড়ে, তোমার portrait-টা আঁকার সময়ে তোমার সেই magenta রঙের শাড়িতে নীল অপরাজিতার শোভা ! মনে হয়েছিলো তুমিই তো আমার Princess Charming ! আমাকে তো এতো দিনে বেশ ভালোই চিনলে সুজাতা, কিন্তু তাও কেন আমাকে ভালোবাসো বলো তো !

( ঋষির গালে আলতো একট চুমু খায় সুজাতা। )

--- তোমার ওই অগোছালো "তুমি"-টাকে feel করাই তো আমার অভ‌্যেস। তোমার ওই দাড়িময় গালে হাত বোলানোটা আমার অভ‌্যেস। তোমার cigarette-এর ধোঁয়ার নীলচে আভায় তোমার মুখটাকে দেখা আমার অভ‌্যেস। আর এরকম ছোটো ছোটো অভ‌্যাসগুলোই আমাকে তোমার মনের দিকে ঠেলে নিয়ে যায় প্রত‌্যেক মুহূর্তে।

( এবার কেঁদে ফেললো ঋষি। এই কান্নাটা হয়তো ও এই বিগত সাত বছর ধরে চেপে রেখেছিলো বুকে। নিজের আত্মগত পরিচয়টাকে হয়তো চেপে রাখতে চেয়েছিলো সুজাতার চোখের কালোয়। ও সুজাতাকে কখনও মুখ ফুটে মনের কথা বলতেও পারেনি, আবার বলতেও পারেনি যে ভালোবাসে না। সুজাতারও অবস্থাটা ঠিক এরকমই ছিলো। এই অদ্ভুত ভালোবাসার পরিণতিটা এলো ঋষির চোখের জলে। সুজাতাকে জড়িয়ে ধরলো। )

--- I love you সুজাতা, I love you so much ! তুমি কিচ্ছু ভেবো না, আজকে আমি নিজে phone করবো তোমার বাবা-কে। সব বলবো। যা হয় হোক। কিন্তু তুমি ছাড়া আমার artist হওয়াটা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে সুজাতা। তুমি ভেবো না, কেঁদো না আর। আর আমার কোনও আচরণে কষ্ট পেতে হবে না তোমাকে। আমি তোমাকে মুখ ফুটে কোনও কথা কোনও দিনই বলতে পারিনি। নিজের খোয়াবের অলীক দুনিয়ার কবলে নিজেই পড়েছি বারবার। তাই তোমাকে আলাদা করে আর চেনা হয়ে ওঠেনি আমার।



কিন্তু, আজ বসন্তের এই উষ্ণ দুপুরে তুমি যেন স্পষ্ট হয়ে উঠলে আমার সামনে। আসলে ছেলেবেলায় মা-বাবা দুজনকেই হারিয়েছি তো! তাই ভালোবাসার প্রকৃত মর্মটা ঠিক মতো বুঝিনি কোনও দিনই। এই এতো বড়ো পৈতৃক ভিটেতে ওই রঘুদা-ই আমার একমাত্র সম্বল। তবে সত‌্যি বলতে গেলে, তোমার সাথে এই যে সাত বছর আমি কাটিয়েছি, আমি সত‌্যিই অনেক কিছু বুঝেছি, শিখেছি। তুমিই শিখিয়েছো ভালোবাসার অর্থ। কেবল নিজের অবিন‌্যস্ত জীবনের থেকে তোমাকে দূরে রাখছিলাম। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, এই জীবনে তোমাকে আমার খুব বেশি প্রয়োজন। তুমি বোঝো আমাকে অনেক গভীরে গিয়ে।

--- I love you too ঋষি! আমার মতো খুশি এই মুহূর্তে হয়তো আর কেউ নয়। তোমায় আমায় মিলে এবার আমরা হবো একাত্ম।

( এমন সময়ে Grandfather clock-টা জানালো, বিকেল চারটে --- ঢং, ঢং, ঢং, ঢং। বাইরে থেকে ভেসে আসলো কোকিলের কন্ঠস্বর। মিলে গেলো পরস্পরের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা দুটো মন। )

---- ( অভ্র )






















Post a Comment

0 Comments