অলীকপুরের লোককথা // পর্ব - ৭ // সুব্রত মজুমদার

31


বটেশ্বর এতদিনে কোন ডাক্তার পেশেণ্ট পেয়েছে, তাই সে ডাক্তারি কায়দায় চেকআপের জন্যে পঞ্চানন ডাক্তারের স্টেথস্কোপটি গলা থেকে খুলতে গেল। আর তাতেই ঘটল বিপত্তি। সাপবাবাজী পঞ্চানন ডাক্তারের আশ্রয় ত্যাগ করে বটেশ্বরের আলখাল্লার ভেতরে ঢুকে গেল। একটানা দাঁড়িয়ে থাকা, আতঙ্ক আর অনিদ্রায় পঞ্চানন ডাক্তার মাটিতে পড়েই অজ্ঞান হয়ে গেলেন। সবাই তাকে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে গেল শুশ্রূষার জন্যে।


       বটেশ্বর হাতের ভঙ্গি করে করে নানান নৃত্যের নমুনা দেখাতে লাগলো। উপস্থিত দর্শকদের হাততালিও পড়ল। বটেশ্বরের নৃত্যপটুতা আমজনতার ভালো লাগলেও হাতিডোবা গ্রামের মাতব্বরদের ভালো লাগলো না। তারা এসবকিছুতেই অলীকপুরের অসাধু পরিকল্পনার ইঙ্গিত পেলেন।


সুভাষখুঁড়ো বললেন, "আর নয়, জল নাকের উপরে চলে গেছে। এবার কিছু একটা করতে হবে।"


রসিকদাদু একটু সুস্থ্য হয়েছেন। তিনি এখনও সাপের ব্যাপারটা মামুলি বলে মেনে নিতে পারছেন না। তার দৃঢ় বিশ্বাস অলীকপুরের কুচুটেগুলো তার বুড়ো হাড়ে সর্পবাণ মেরেছে। নেহাত দুধ-ঘি খাওয়া ব্যায়ামলব্ধ শরীর তাই কাবু করে উঠতে পারেনি। একজন কমবয়সি ছোকরা শুধু বলেছিল, "দাদু, তোমার বাড়িতে দুধ-ঘি কবে হতে হয় ? ঠাকমা তো তোমার জন্য দুবেলা গাঁদাল পাতার ঝোল রাঁধে।"


রসিকদাদু লাফিয়ে উঠে গালাগালি দিয়ে দিয়ে বললেন, "তোর এত পাকামো কেন রে ! আমি কি খাই কি না খাই তার হিসেব তোকে দেব। পাজী গর্দভ....."


সুভাষখুঁড়ো বললেন, "রসিকখুঁড়ো, আমাদের উচিত হবে অলীকপুর আক্রমণ করা। "


সুভাষখুঁড়োর কথায় কর্ণেল সরকার সন্মতি প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, "আক্রমণ হবে গেরিলা কায়দায়। আমি সামনে থাকব। ভারত-চিন যুদ্ধে যেমনভাবে লড়াই করেছিলাম তেমনি লড়ব। জীবন যায় যাক, সন্মান ...কভি নেহি।"


কর্ণেল সরকারের রণং দেহি মনোভাবে হাতিডোবার সকলে অনেকটাই অক্সিজেন পেল। তারা মহাভারতীয় কায়দায় কর্ণেল সরকারকে সেনাপতি হিসেবে মনোনীত করলেন। মহান্তজী হলেন উপসেনাধ্যক্ষ, -- অবশ্যই পদাধিকার বলে। হাতিডোবা গ্রামে মহান্তজীর একগুঁয়েমি সর্বজনবিদীত। ইতিহাসেও তার মতো চরিত্র আছে, যাদের জেদের কাছে অনেক সম্ভাবনা ও প্রতিভা নষ্ট হয়ে গেছে। যাইহোক এটা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়।


    মহান্তজী উপসেনাধ্যক্ষ হয়েই কর্ণেল সরকারের ডানা ছাঁটলেন। বললেন, "কর্ণেল বাবা খুব গরম মাথার লোক, ওর সব কথা তোমরা ধরো না বাবারা। আমি বলছিলাম কি..."


মহান্তজীর কথা শেষ হবার আগেই সভাস্থ একজন লাফিয়ে উঠে বলল, " ওসব প্রেম বিলিয়ে হবে না প্রভূ, প্রেম বিলোতে হলে অলীকপুরে মায়া ঠাকুমার কাছে প্রেম বিলোন। আমরা পরমাণু হামলা চাই।"


মহান্তজী রাগে গজগজ করতে লাগলেন। রসিকদাদু বললেন," পরমাণু মানে অ্যাটম বোম ! তা তোমরা পারো বাবা। ইস্কুলের গণ্ডিটা না পেরোনোর এই এক ঝামেলা।"


কর্ণেল সরকার বললেন," ওসব ছাড়ুন তো ! এবার কাজের কথায় আসা যাক। আমরা আজ রাত্রে অলীকপুরে হানা দেব গেরিলা কায়দায়। রজত রায়, অবিনাশ ঘোষ সহ দু'চারজন অলীকপুরের মাতব্বরকে বেঁধে আনলেই কাজ। এবার আমরা শর্ত দেব আত্মসমর্পণ করতে। তাছাড়া যা দাবিদাওয়া সবকিছু আদায় করে নেব।"


মহান্তজী বললেন," যা ভালো বোঝো করো, কিছু হলে আমাকে বলো না। "


রসিকদাদু বললেন," আপনি ভজন সাধন করুন মহারাজজী। সঠিক সময় হলে আপনার ভবনে রথ পৌঁছে যাবে। আপনাকে ছাড়া অভিযান অসম্পূর্ণ। "


রসিকদাদুর কথায় মহান্তজী রাগে গজগজ করতে করতে সভা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। এই ঘটনায় কারোর কোনো আফসোস হল বলে মনে হল না। সবাই পরবর্তী আলোচনায় মনোনিবেশ করল।


কর্ণেল সরকার বললেন," সাহেবকে চাপ দিয়ে পজিশনগুলো জেনে নিতে হবে। অনেক তথ্য চাই। বাকি তথ্য সরবরাহ করবে শ্রীকান্ত দাস। ও আজবপুরের লোক, আর ভিক্ষা করতে যায় অলীকপুরে।"     সভা তখনকার মতো শেষ হলো।


                                      কর্ণেল আর রসিকদাদু গেলেন আশ্রমে। সাহেব আর তিন্নির অপলক দৃষ্টিবিনিময় তখনও চলছে। রসিকদাদু একটা মগে করে জল নিয়ে দুজনের মুখে ছুড়ে মারলেন। তিন্নি সম্বিত ফিরে পেয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল," এ মা, কত বেলা হয়ে গেল ! যাই আবার বাবার শরীরটা খারাপ, পথ্যি দিইগে।"


  তিন্নি চলে গেলে সাহেবের দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রসিকদাদু বললেন, "কিছু খেয়েছ ?"


সাহেব মাথা নেড়ে সন্মতি জানাল। তার মুখে কাপড় বাঁধা। ব্যাপারটা বুঝে কর্ণেল সরকার সাহেবের মুখ হতে বাঁধনটা খুলে দিলেন। এরপর কর্ণেল জিজ্ঞেস করলেন," কি অভিপ্রায়ে আসা হয়েছে ? হাতিডোবায় যা ঘটেছে তা সন্মন্ধে কি জান ? আমি রিটায়ার্ড কর্ণেল, আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না।"


সাহেব বলল, "আমি কিছুই জানিনা। বাবা ডাক্তারবাবুকে ডাকতে বললেন তাই এসেছি। আমাকে ছেড়ে দেন, আমার সামনে পরীক্ষা। আমি আর কোনোদিন এ গাঁয়ে আসব না। "


রসিকদাদু বললেন," ঘুঘু দেখেছ বাছাধন !.... ঘুঘুর ফাঁদ কেমন হয় এবার দেখতে পাবে। শুধু তুমি নয়, তোমার মেন্টররাও বুঝতে পারবে এই হাতিডোবা কি বিষম ঠাঁই। "


সাহেব দু'চোখে অন্ধকার দেখতে লাগল। সামনে কোনো আশার আলোই দেখা যাচ্ছে না। কি কুক্ষণেই সে অলীকপুর হতে বেরিয়েছিল !


                                             --৫--


                     হাতিডোবা আর অলীকপুরের মাঝখানে ক্যানেল, আর ক্যানেলের পাশেই ঘন বন। এই বনের একচ্ছত্র সম্রাট হল ডাকু ছপ্পর সিং। ছপ্পর সিংয়ের আসল নাম প্যাঁকা। অলীকপুর আর হাতিডোবায় প্যাঁকা চোরের জ্বালাতনে ঘটিবাটি রাখাই দায় হয়েছিল। সরু লিকলিকে চেহারার প্যাঁকা চোর সিঁদ কেটে অনায়াসে লোকের বাড়িতে ঢুকে পড়ত। তারপর শুরু হত আসল খেলা।


প্যাঁকার সাথে থাকত দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরী ক্লোরোফর্ম। সিঁদ কেটে প্রথমে সেই গর্তে একটা চোখ-মুখ আঁকা মাটির হাঁড়ি লাঠির সাহায্যে ভরে দিত। বাড়ির কেউ জেগে থাকলে মানুষের মাথা ভেবে প্রথম আক্রমণ হবে ওই হাঁড়ির উপর। আর সতর্ক হয়ে যাবে চোরবাবাজীবন, - এবং থলি ঝুলি নিয়ে ভাগলবা।


... চলবে

Post a Comment

0 Comments