৮৮ বছরের জীবন্ত কিংবদন্তি গোপালদাস মুখোপাধ্যায় // তৈমুর খান

৮৮ বছরের জীবন্ত কিংবদন্তি গোপালদাস মুখোপাধ্যায় // তৈমুর খান



যাঁকে একবারও চেনার সুযোগ হয়নি, দেখার সুযোগ হয়নি, যাঁর সঙ্গে ফোনালাপও ছিল না — আজ তাঁর কথাই বলতে চেয়েছি। না, তিনি কবি নন, উপন্যাস লিখেছেন যদিও, তবু প্রত্নতাত্ত্বিক এবং প্রাচীন শিল্প-ভাস্কর্যের গবেষক হিসেবেই বেশি পরিচিত।

.
নিজ উদ্যোগে প্রায় ৭২ টি মন্দির সংস্কার ও আন্তর্জাতিক মানের দর্শনীয় ঐতিহাসিক তথ্যভিত্তিক স্থানে নিয়ে যাওয়া কম কথা নয়। তাঁর প্রচেষ্টাতেই কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠান (২ রা অক্টোবর ২০১৫) সম্ভব হয়েছে।
.
এই লোকটির নামই গোপালদাস মুখোপাধ্যায়। জন্মেছেন ১৯৩১ সালে, বীরভূম জেলা সংলগ্ন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের মলুটী গ্রামে। ব্রিটিশ আমলে পড়াশুনো করে ম্যাট্রিকুলেশান পাশ করে ইয়়ারফোর্সে চাকরি গ্রহণ করেন। ভারত-চিন যুদ্ধে অংশ নেন। বহু দেশ ঘোরেন। ১৯৫১ থেকে মাত্র ১৫ বছরের চাকরি জীবন থেকে অবসর নেন।

.
অবশ্য চাকরি করা কালীন উচ্চতর পড়াশুনোয় ছেদ পড়েনি। পরবর্তীতে তিনি ডবল এম এ পাশও করেন। সৈনিক জীবন থেকে স্কুলমাস্টারির জীবনে প্রবেশ করেই তিনি রাজার গ্রাম মলুটীতে ছড়িয়ে থাকা মন্দিরগুলি সংরক্ষণ তথা সংস্কারে মনোযোগী হন। ইতিমধ্যে ঝাড়খণ্ড সরকারের নির্দেশে ক্ষেত্রসমীক্ষার কাজটিও সম্পন্ন করেন।
.

অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ। গ্রাম্যজীবনের আড়ালে থেকেই তিনি ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধান যেমন করেছেন, তেমনি সভ্যতার আদিম নিদর্শনগুলিও সযত্নে সংরক্ষিত করেছেন। সন্তানহীন এবং স্ত্রী বিয়োগের পরও কোনও সময়ের মধ্যেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েননি। এখনও জীবনের দীর্ঘপথ পরিক্রমার নানা অভিজ্ঞতা জানিয়ে দিচ্ছেন।

.
ইংরেজি, বাংলা দুই ভাষাতেই সমান লিখে গেছেন। উল্লেখযোগ্য বইগুলো হল —  গ্রেগরী মুখার্জি ছদ্মনামে তিনখানি উপন্যাস “নতশির ঊর্মি” , “গোপালপুরের উপকথা” , “মোতিবাঈ” । ১৯৮১ সালে নিজ নামে লেখেন “দেবভূমি মলুটী” । ২০০২ সালে গল্পের মধ্যে দিয়েই ইতিহাসের কিংবদন্তির কাহিনি “বাজের বদলে রাজ” লেখেন। ২০০৭ সালে লেখেন “Temples of Maluti” , ২০১০ সালে সম্পূর্ণ তথ্যভিত্তিক গবেষণা গ্রন্থ “নানকার মলুটী” । ২০১৭ তে প্রকাশিত হয় “ Temple Village Maluti”  .
.
সুলতান হুসেন শাহর সময় থেকেই বাংলার সংস্কৃতিতে কত মিথ তৈরি হয়েছে মঠ মন্দির নির্মাণকে কেন্দ্র করে তারই একটা সঠিক ইতিহাস তিনি অনুসন্ধান করেছেন। এবং প্রতিটি নির্মাণেরই একটা প্রেক্ষিত তুলে এনেছেন।
.
নানকার তালুকের রাজারা তাঁদের রাজধানী মলুটীতে নিজেদের বাসের জন্য কোনও দালাল কোঠা নির্মাণ করাননি। কিন্তু দেবদেবীর বাসের জন্য ব্যয়বহুল মন্দির নির্মাণ করিয়েছেন। কালের গর্ভে তা একদিন হয়তো নিমজ্জিত হয়ে যেত, আমরা ইতিহাসের বিরাট সাক্ষীগুলি হারিয়ে ফেলতাম, যদি না গোপালদাস মুখোপাধ্যায় না ঘুরে দাঁড়াতেন।

.
মৌলীক্ষা এখানকার রাজদেবী, এই দেবীর কাছেই বীরভূমের পরম সাধক বামাক্ষ্যাপার সিদ্ধিলাভ ঘটে। এই ইতিহাস তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করেছেন। তেমনি প্রাচীন সাহিত্যগুলিতে মলুটীর অবস্থান কোথায় তাও উল্লেখ করেছেন।

.
বিদেশীরা আজও মলুটীতে দলে দলে আসেন। প্রাচীন বাংলার ঐশ্বর্যে ঐতিহ্যে ইতিহাসে স্নাত হন। সমরেশ বসুও তাঁর লেখায় মলুটীর কথা উল্লেখ করতে ভোলেননি। তাঁর “কত অজানারে”  বইটিতে মলুটীর গৌরবময় ইতিহাসের সগর্ব উল্লেখ আছে। ১৮৫৫ সালে বাংলা থেকে মলুটী ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু কে বলবে মলুটী বাংলার নয় ?
.

গোপালদাস মুখোপাধ্যায় খুব ঝরঝরে স্মৃতিতে আমাদের অনেক কথা শোনালেন। বৌদ্ধদর্শন থেকে হিন্দুদর্শন, মুসলমান শাসক এবং রাজাবাদশাদের কাহিনি। আন্তরিকতা আর মানবিক রসের আবেদনে জীবন্ত হয়ে উঠল প্রাচীন ইতিহাস। অন্তরে জেগে উঠল ভক্তি ও সমীহ। তাঁর পড়াশুনো, তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োগের সঠিক ব্যবহার দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

.

.

.

Post a Comment

0 Comments