দৃষ্টিকোণ // সৌমেন চ্যাটার্জি

https://www.smritisahitya.com


.


.


কোর্ট চত্বর আজ লোকে লোকারণ্য।ভবানীপুর গ্রামের কমবেশি সকলেই উপস্থিত আছেন ।প্রেসের লোকজন আছেন।আর আছেন মুকুন্দ বাবুর বেশ কিছু বন্ধু বান্ধব।মুকুন্দ বাবুকে নিয়েই কেস। আজই এ কেসের রায়দান হবে।মুকুন্দ বাবু ভবানীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ।অতি সজ্জন ।অন্তত দীর্ঘ কুড়ি বছরের চাকুরিজীবনে এলাকাবাসীর চোখে তিনি সজ্জন হিসাবেই পরিচিত।


.


.


তাঁর ভালো মানুষের মুখোশ টা সপ্তাহ খানেক আগে খুলে না গেলে গ্রামের মানুষ সারাজীবন একটা খারাপ মানুষ কেই ভালো ভেবে যেতেন। এই মুখোশখোলার কৃতিত্ব টা অবশ্য শিবু মুদির বৌ এর।শিবুর বৌ সেদিন স্কুলের সামনের কল থেকে জল আনতে গিয়েছিলেন ।বালতি পুরো ভর্তি হওয়ার আগে তার চোখ চলে যায় স্কুলের ক্লাস ঘরে।মুকুন্দ বাবু তখন দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্লাস নিচ্ছেন ।কিন্তু কোথায় পড়ানো।তিনি তো ক্লাসে ছাত্র দের সাথে নেচে চলেছেন ।


.


.


পাসে মিউজিক সিষ্টেম।তাতে গান বাজছে।ছাত্র রাও গলা মিলিয়ে গান করছে।পড়াশোনা লাটে উঠেছে ।ব্যাস আর যায় কোথায় শিশুর বৌএর জল নেওয়া মাথায় উঠল।তিনি সঙ্গে সঙ্গে হাবুর বৌ,খেদীর মা,আরো অভিভাবকদের ডেকে আনলেন ।মাস্টার মশাই কে হাতে নাতে ক্লাসের মধ্যে নৃত্যরত অবস্থায় ধরা হয়েছে ।তিনি অভিভাবকদের কিছু একটা বলে দমানোর চেষ্টা করলেন কিন্তু তাদের সম্মিলিত চিৎকারে তাঁরসে চেষ্টা ব্যর্থ হল।


.


.


কিছুদিন আগে এক উচ্চ পদস্থ পুলিশ অফিসার কেও থানার মধ্যে ডিউটির সময় নৃত্যরত থাকার খবর গ্রামেরমানুষ টিভির পর্দায় দেখেছে।তিনি নাকি বাড়ির কাছাকাছি বদলি পাওয়ার আনন্দে একটু নেচেছিলেন ।তা বলে এভাবে একজন শিক্ষক পড়ানো বাদ দিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের সামনে নাচবেন এ যে তাদের কল্পনারও অতীত।খবর পেয়ে শিক্ষা আধিকারিক রা ছুটে আসেন ।পুলিশ এসে মুকুন্দ বাবুকে উদ্ধার করেন।মুকুন্দ বাবু এখন কাঠগড়ায় ।সরকারি উকিল তাকে প্রশ্ন করেন আপনি সত্যিই ক্লাসের মধ্যে নাচছিলেন মুকুন্দ বাবু।


.


.


মুকুন্দ বাবু বললেন একদম সত্যি কথা।আমি নাচছিলাম।তাঁর স্বীকারোক্তি তে মুকুন্দবাবুর উকিল ও হাল ছেড়ে দিয়েছেন ।তবু তিনি শেষ চেষ্টা করলেন মহামান্য আদালত আইন প্রমাণ ছাড়া কোনও কথা বিশ্বাস করেনা।কী প্রমাণ আছে যে মুকুন্দ বাবু নাচ ছিলেন ।সে আশাতেও মুকুন্দ বাবুনিজেই জল ঢেলে বললেন প্রমাণ আমার কাছেই আছে।আমি যখন নাচ ছিলাম এক ছাত্র কে দিয়ে সেটা আমার মোবাইলে ভিডিও রেকর্ডিং করিয়েছি।অনুমতি দিলে আমি সেটা দেখাতে পারি।অনুমতি দেওয়া হল জর্জ সাহেব বললেন ।তিনিও এরকম কেস কখনও দেখেননি ।অভিযুক্ত নিজেই আদালতের হাতে তথ্য প্রমাণ তুলে দিচ্ছেন ।


.


.


রেকর্ডিং টা চালু করা হল পরিস্কার দেখা যাচ্ছে মুকুন্দ বাবু নাচছেন।পাশে গান বাজছে বাবুরাম সাপুড়ে কোথা যাস বাপুরে।আয় বাবা দেখে যা দুটো সাপ রেখে যা।ছোটদের ছড়ার গান ।ছাত্র রাও তাতে গলামেলাচ্ছে ।এবার মুকুন্দ বাবু বলতে শুরু করলেন ।এটাকে বলা হয় নান্দনিক শিক্ষা ।ছড়াগুলো গানের আকারে পড়ালেতা আরো মনোগ্রাহী হয়।শিখতে পারে বেশি ।পড়াকে কখনও বোঝা বলে মনে হয়না।আর হাল্কা কোমর আমি দুলিয়েছি কারণ আমি তখন গানের সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম।যা সত্য তাই বললাম ।


.


.


আদালত আমাকে যা শাস্তি দেবে আমি মাথা পেতে নেব।জর্জ সাহেব সব শুনে রায়দান করলেন।ভারতীয় সংবিধানের প্রতি যথাযথ সম্মান জানিয়ে আমি আজ থেকে প্রতিটি বিদ্যালয় কে ভবানীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মুকুন্দ বাবুর মহৎ চিন্তাধারা কে গ্রহণ করার অনুরোধ জানাচ্ছি।অভিনন্দন মুকুন্দ বাবু আপনি আজ থেকে এভাবেই পড়াবেন।প্রেসের লোকেরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে মুকুন্দ বাবুর কাছ থেকে কিছু শোনার জন্য ।কিন্তু কোথায় মুকুন্দবাবু তিনি তখন গ্রামের লোকেদের কাঁধে চেপে চলেছেন তাঁর সাধের বিদ্যালয়ে ।


.


.


(সমাপ্ত )


.


.

Post a Comment

0 Comments