শয়তানের থাবা - পর্ব - ১৩ // সুব্রত মজুমদার


sahityalok.com
Photo : Subrata Majumdar

 
 
বাথরুম হতে মুখ হাত ধুয়ে এসে ওয়াটার হিটারে কফি বানালাম। কথাটা আপনাদের বলাই হয়নি, ওয়াটার হিটার কাম মিনি কফিমেকারটা আমি শিলিগুড়ির হংকং মার্কেট হতে কিনেছি। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে মেঅঘোরবাবু বললেন, "এই ডায়েরিটা আপনি কোথায় পেলেন মশাই ?" 
আমি বললাম, "সে খোঁজে আপনার কাজ কি ? আমি কোথায় কি পাচ্ছি কি পাচ্ছি না তার   সবকিছুই কি আপনাকে বলতে হবে ?" 
 
আমার কথায় একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন অঘোরবাবু।  তিনি আমতা আমতা করে বললেন, "শুধু শুধু রেগে যাচ্ছেন মশাই । আমি আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাতে চাইছি না, আসলে হল কি মশাই ... ডায়েরিটা আমার চেনা। "
 
" চেনা মানে ! এ ডায়েরিটা আপনি আগে দেখেছেন ? " আমি সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করি। অঘোরবাবু কফির কাপে একটা লম্বা চুমুক লাগিয়ে বললেন, " বিক্রমের কাছে দেখেছি। কি যেন মার না কি নাম, সেই শয়তানটার কথা আছে এতে। আরে মশাই এই গ্যাংটকের খুনগুলোও তো ওই শয়তানটাই করছে। "
 
"এসব জেনেও আপনার মতো ঘুঘু লোক এখানে বেড়াতে এলেন, - এটাও আমাকে মানতে হবে !"  আমি খানিকটা শ্লেষের সঙ্গেই বললাম। 
অঘোরবাবু কফির কাপটা নামিয়ে রেখে একটু ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতেই বললেন," আমি কি আর নিজের ইচ্ছায় এসেছি মশাই ! রীতিমতো ব্রেইনওয়াশ করেছে আমার। পেছনেই আসছি বলে বেপাত্তা। তবে হ্যাঁ, শয়তানের হাত হতে বাঁচতে মহাশক্তিশালী একখান কবচ দিয়েছে। এই দেখুন।" 
 
 
 
অঘোরবাবু তার ঘুনসিতে বাঁধা পেল্লাই সাইজের কবচখানা দেখালেন। কুসংস্কারের বহর দেখে আমারও মেজাজ ভালো ছিল না, আমি তৎক্ষণাৎ ঘুনসি হতে কবচখানা ছিঁড়ে নিলাম। অঘোরবাবু আচমকা আক্রমণে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। আমিও কৌতুহলী হয়ে কবচটার ভেতরের মালমশলা বের করতে সচেষ্ট হলাম। একটু চেষ্টাতেই কবচ হতে বেরিয়ে এল একটা ভাঁজ করা চিরকূট। চিরকূটটা পড়েই আমার হাসির বাঁধ ভেঙ্গে গেল। আমি হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়লাম। 
 
ব্যাপার দেখে অঘোরবাবু আমার হাত হতে চিরকূটখানা নিয়ে পড়তে লাগলেন, "  'ধাপ্পা ! অঘোরবাবু ইন দ্য ভোগ অফ মা' ।"  এরপর অঘোরবাবু খ্যাপা ষাঁড়ের মতো ফুঁসতে লাগলেন।  " মানহানির মামলা করব মশাই ! বিক্রমবাবুর সঙ্গে আমার সমস্ত সম্পর্ক শেষ মশাই । বাপের বয়সের একটা মানুষের সাথে এমন রসিকতা কেউ করে..."   
 
 
আরো কি কি বললেন তা শোনার সময় আমার ছিল না। আমি ভাবছি একটা কথা, যে ডায়েরির কথা বুড়ো আর আমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা সেটা পাবলিক হয় কি করে ! কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। তাছাড়া বিক্রমের মতো নামজাদা গোয়েন্দাই বা কেন নিজে না এসে অঘোরবাবুকে সিকিমে পাঠিয়ে দিলেন ! অনেক প্রশ্ন দানা বাঁধছে, যেগুলোর উত্তর পাওয়াটা জরুরী। এ এমন একটা জটিল ধাঁধা যেখানে আমার মতো অনেকেই জড়িয়ে পড়েছেন, কেউ জেনে বা কেউ না জেনে। 
 
ভেবেছিলাম অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমোব, কিন্তু তা আর হলো না। অঘোরবাবু আমার ঘুমের পিণ্ডি চটকে দিয়েছেন। আমি অঘোরবাবুকে বললাম, "আপনার প্রতিবেশীটি খুবই সেয়ানা, গোলমাল বুঝেই সরে পড়েছে। আর আপনাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে গিয়েছে। এবার মরুন শয়তানের হাতে।" 
অঘোরবাবু কিছুক্ষণ গুম হয়ে থাকলেন, তারপর  বিপুল ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। "একবার বেঁচে ফিরি তারপর দেখেনেব টিকটিকির বাচ্চাকে। বুঝলেন মশাই, দাপুটে লোক ছিলাম আমি, আপিসেই বলুন আর বাড়িতেই বলুন বাঘে গরুকে একঘাটে জল খাওয়াতাম আমি। আর সেই আমাকেই কিনা.... " 
 
 
 
    আর বলতে পারলেন না অঘোরবাবু, তার দু'চোখে বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। আমিও বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত্বনা দিয়ে তাকে শান্ত করলাম। 
অঘোরবাবু চলে যেতেই একটা বিশ্রীরকম হাসতে হাসতে বুড়ো ঘরে ঢুকল। সে আসতেই আমি তার উপর আক্রমণ শানিয়ে দিলাম। 
" আসুন আসুন মহোদয় ! আপনার আগমনেরই প্রতীক্ষা করেছিলাম। সত্যি করে বলুন তো আপনার এই ভজকট ব্যাপারে আর কতজন জড়িয়ে আছে ?" 
 
আমার কথায় একটুও বিচলিত না হয়ে বুড়ো একপ্রস্থ কান এঁটো করা হাসি হেসে নিলেন। তারপর বললেন, "সময় খুবই বলবান  ভায়া, সময় হলেই সব জানতে পারবেন । আপাতত একটা জিনিস দেখাই... "    এই বলে তিনি দরজার কাছে এগিয়ে গেলেন। তারপর দরজার বাইরেটা উঁকি দিয়ে দেখেই দরজাটা লাগিয়ে দিলেন। ছিটকিনি এঁটে বিছানায় এসে বসলেন। এরপর পকেট হতে কয়েকটা ধাতুর টুকরো বের করে সমনে রাখলেন । 
 
মোট চারটে টুকরো। পেতলের,... উঁহু এ তো পেতল নয়, - নিখাদ সোনা। আর কিছু গুন থাক বা না থাক জিওলজিস্ট বন্ধুর কল্যাণে ধাতু রত্নের ব্যাপারে একটা অভিজ্ঞতা তৈরী হয়েছে।  টুকরোগুলো বিভিন্ন আকৃতির। প্রত্যেকটি টুকরোতেই  বিশেষ খাঁজ আছে। বুড়ো সেই খাঁজ বরাবর টুকরোগুলো জুড়ে দিতেই একটা চক্রের আকার নিল। আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। 
 
বুড়ো বলল, "শয়তানের পাঞ্জার চাবি। যে শয়তানটা অত্যাচার করে বেড়াচ্ছে তার কাছে পৌঁছনোর একমাত্র উপাই। বৃহদতন্ত্রিকা মতে কোনও এক নির্জন পর্বতগহ্বরে আছে একটা যন্ত্র, যে যন্ত্রকে বিশেষ মন্ত্রে অভিষিক্ত করে এই বিশেষ চাবি ঘোরালেই উন্মুক্ত হবে সময়যন্ত্র, আর এই সময়যন্ত্রই নিয়ে যাবে শয়তানের কাছে। "
 
আমি বললাম," কিন্তু সেই জায়গাটা কোথায় ? আর আমার এটুকু বাহ্যজ্ঞান আছে যা দিয়ে সহজেই বুঝতে পারি যে আপনার মানসিক সুস্থ্যতা কোন পর্যায়ে। এটা জিনগত রোগ মৈত্রমশাই, আপনার বাবার থেকে আপনি পেয়েছেন। "
 
বুড়ো কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আমার দিকে চেয়ে বললেন," শশাঙ্কশেখর মৈত্রের কোনও মানসিক ব্যাধি ছিল না, সেটা আমি যথাসময়ে প্রমাণ করে দেব। কোনও ভাবেই তিনি হ্যালুসিনেটিং করছিলেন না। আর আপনার সব প্রশ্নের উত্তর আছে ইয়ামথাং-এ। "
 
" চলুন, কালকেই তো ইয়ামথাং যাচ্ছি। আর হ্যাঁ, মৃগাঙ্কবাবু পালিয়েছেন।" আমি তার দিকে কফির কাপ এগিয়ে দিলাম। বুড়োটা এবার একটা রহস্যময় হাসি হেসে বলল," মৃগাঙ্কবাবু শয়তানের পূজারী, উনি চাবি না নিয়ে কোত্থাও যাবেন না। অতএব আপনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন, অঘোরবাবুর পহেলা নম্বর শত্রু এখনি বিদায় নিচ্ছেন না। "
 
আমি অবাক হয়ে বললাম," অঘোরবাবুর কেসটাও জানেন ! তাহলে আর বাকি কি রইল ! আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে আপনিই নাটের গুরু। দেখুন মশাই, আমার সাতকুলে কেউ নেই, ঝাড়াহাতপা' মানুষ আমি, তাই আমার কিছু হলেও দুনিয়ার এমনকিছু একটা ক্ষতি বৃদ্ধি হবে বলে মনে করি না। তাই  কাল যাচ্ছি।" 
 
পরেরদিন ইয়ামথাং এর উদ্দেশ্য রওনা দিলাম। আমাদের গন্তব্য ইয়ামথাং, ফ্লাওয়ার ভ্যালি আর জিরো পয়েন্ট। সকাল সকাল গাড়ি রওনা দিল। 'ইন্ডিয়ান বাইপাস রোড' বরাবর চলতে লাগলো গাড়ি। যাত্রীদের মধ্যে কেবল মৃগাঙ্কবাবু নেই। অঘোরবাবু আজ আমার পাশেই বসেছেন, আর নিয়মিত বকরবকর করে চলেছেন। একটা বাঁক ঘুরতই অঘোরবাবু আনন্দের আতিশয্যে চিৎকার করে উঠলেন, "ইয়াআআ...! মেঘের ভেলায় ভেঁসে চলেছি মশাই... জীবন আমার সার্থক হলো।
 
 
 
এখন যদি শয়তানের হাতে মরেও যাই তবুও কোনো আফসোস নেই মশাই !"  আনন্দের আতিশয্যে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। সত্যিই খুব মায়াময় লাগছে। এত কাছ দিয়ে মেঘেদের দল উড়ে যাচ্ছে যে দেখে মনে হচ্ছে আমাদের গাড়িটা মেঘের ভেলার উপরে সওয়ার হয়ে ভেঁসে চলেছে অনন্তের উদ্দেশ্যে। এ অনুভূতি একমাত্র সেই বুঝতে পারবে যার অভিজ্ঞতা হয়েছে, এ সৌন্দর্য্য বর্ণনাতীত। ঈশ্বরের সকল সৃষ্টির বর্ণনা কবিও করতে পারেন না। আর উপনিষদে তো জগৎস্রষ্টাকেই   কবি বলে বর্ণনা করা হয়েছে , তিনি কবি না হলে এই সুন্দর সৃষ্টি কিভাবে সম্ভব ! 
 
 
 
 
 

Post a Comment

0 Comments