প্রায় ঘন্টাখানেক লাগল। গরম গরম ভাত,ডাল, আলু-ভাজা, লাউয়ের তরকারি আর মাছের ঝোল। খাবার যথেষ্টই সুস্বাদু। খাওয়া দাওয়া সেরে আবার গাড়িতে উঠে পড়লাম। রায়গঞ্জ পেরিয়ে সন্ধ্যা নামল। বিক্রম আর এগিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী নয়। অগত্যা একটা গ্রামে আতিথ্য গ্রহনের সিদ্ধান্ত নেওয়া গেল।
এখনকার গ্রামবাংলা কিন্তু আগেরমতো আর নেই। অচেনা লোকজনকে কেউই আশ্রয় দিতে চায় না। প্রত্যেকের মুখে একই কথা, "দিনকাল খুব খারাপ দাদা, ইচ্ছা থাকলেও সবদিক বিবেচনা করে পিছিয়ে যাই। খারাপ ভাববেন না, মানুষের বেইমানিই এই দিনটা ডেকে এনেছে।"
আমরা যখন প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছি ঠিক তখনই একটা ছেলে দেবদূতের মতো হাজির হলো। সে বললো, "আমার বাড়িতে চলুন। আমি সায়কবাবুর 'শয়তানের থাবা' পড়েছি।বিক্রম গোয়েন্দা আমার খুব ফেভারিট ক্যারেক্টার।"
ছেলেটা আমাদের ওর বাড়িতে নিয়ে গেল। বালাগাছি করা ঘর, টিনের চাল, সামনে বিশাল উঠান। ঘরটা দোতলা, উপরনিচ মিলিয়ে তিন তিন মোট ছ'টা রুম। আমাদের ঠাঁই হল উপরতলার একটা রুমে। খাওয়া দাওয়ার পর ছেলেটির মা দেবলীনাকে ডেকে নিয়ে গেল। ছেলেটা আমাদের সঙ্গেই শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিক্রম ঘুমিয়ে পড়লেও আমার ভাগ্য আমাকে সে সূযোগে বঞ্চিত করলেন। যতবার ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে ততবারই ছেলেটির প্রশ্নবাণ ধেয়ে আসে আমার দিকে।
টাইম মেশিনটার কি হল, মোহাবেশ হঠাৎ করে গল্পে এসে পড়লে কেন, ক্রিস্টাল ড্রাগনটার কথা তো কিছুই লিখলেন না, ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে মাথা ধরে এল। বললাম, "পরের গল্পে সব উত্তর দেব, এখন ঘুমাও।" অবশেষে ঘুম এলো।
সকাল সকাল উঠে আবার রওনা হলাম। গাড়ি কিশানগঞ্জ হয়ে চলল, মধ্যমাদারিহাটের কাছাকাছি একটা জায়গায় রাত্রিবাস করতে হল। দেবলীনা বিরক্ত হয়ে বলল, "এরচেয়ে প্লেনে গেলে ভালো হত। এত ধকল সহ্য হয় !"
বিক্রম হেসে বলল," দোষটা সাতচল্লিশের। সেদিন যদি দেশভাগ না হত তবে সোজা খুলনা চাঁদপুর হয়ে পৌঁছে যেতাম। যাই হোক উপাই কি ! এখনো অনেক রাস্তা। তবে হাওড়া হতে আগরতলা ট্রেন ছিল, আমাদের ডাকাত সর্দারের ইচ্ছা ছিল না আমরা ট্রেনে আসি, তাই এত সমস্যা। "
যখন উদয়পুরে পৌঁছলাম তখন আমাদের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন। উদয়পুরের একটা হোটেলে চেকইন করলাম। হোটেল কর্তৃপক্ষই ছবিমুড়া যাবার সব বন্দোবস্ত করে দিলেন। কাল যাব ছবিমুড়ায়। ছবিমুড়াকে এখানকার অনেকে দেবমুড়া বলে থাকেন। দেবমুড়া হিলস।
জায়গাটা অসম্ভব সুন্দর। জঙ্গল আর পাহাড়ের অদ্ভুত সংমিশ্রনে প্রকৃতির এক অনন্যসুন্দর রুপ, - যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কিশোরীর অবিন্যস্ত চুলের মাঝখানে সিঁথির মতো দুপাশের ঘন জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে কালো পিচরাস্তা বেরিয়ে গেছে । গাড়ি গোমতীনদীর তীরে পৌঁছল । বর্ষায় গোমতী যেন উচ্ছল যুবতী। শততরঙ্গভঙ্গে তার উচ্ছ্বাস সে প্রকাশ করছে। ঘাটেই আমাদের জন্যে নৌকা অপেক্ষা করছে। নৌকায় উঠে বসলাম। নৌকার মাঝি জমাতিয়া সম্প্রদায়ের, কিন্তু বাংলা ভালোই জানে। সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় আমাদের অভ্যর্থনা করল।
মাঝির কাছ হতেই জানলাম যে আমরা যেখানে যেত চাই সেখানকার নদীপথ জায়গায় জায়গায় বাঁশ ইত্যাদি গাছ পড়ে অবরুদ্ধ হয়ে যায় । গাছ কেটে রাস্তা পরিষ্কার করার জন্যে একজন অতিরিক্ত লোক নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে নৌকাতে আমরা পাঁচজন। নৌকা চলতে লাগল। মাঝি আর তার সহযোগী ককবরক ভাষায় নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছে। আমরাও কম যাই না। দেবলীনা গান ধরল,
হৃদয় আমার শ্রাবণ মেঘের পারা
ঝরছে দিবারাত্র দিবারাত্র,
ছুটছে যেন পাগলা সে কোন ঘোড়া
ছুটছে দিবারাত্র দিবারাত্র।।
আজকে আমার স্বপ্ন ঝরে পড়ে
কেয়ার বনে পরাগকণার মতো,
সৌদামিনীর চপল চরণ পরে
নৃত্যে রত বৃষ্টিকণা যত;
মনের যতো মলিন আবেগরাশি
ধুয়ে গেল এক্ষুনি এইমাত্র।।
পুবের বাতাস পাগল পারা
ধানের ক্ষেতে দিশেহারা,
নদীর জলে করে খেলা
সারা দিবস রাত্র ।।
বিক্রম এতক্ষণে মুখ খুলল। বিক্রমের মুখে শুনলাম ছবিমুড়ার ইতিহাস। বিক্রম গোমতীর জলের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল, "ছবিমুড়াতে তোমাদের মতোই আমিও প্রথম আসছি। তোমাদের সাথে আমার পার্থক্য একটাই, আমি এ অঞ্চলের ইতিহাস ভূগোলটা যথারীতি পড়ে এসেছি। লাইব্রেরিতে খোঁজ করলে ত্রিপুরার ইতিহাস নিয়ে অনেক বই পাবে।"
আমি বললাম, "সে তো পরের কথা, এখন তুমি যা জান সেটা বল দেখি।"
বিক্রম বলল," ছবিমুড়া হল প্রাচীন ত্রিপুরার অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান। এই অঞ্চলে জমাতিয়া উপজাতির লোকজন বাস করেন। এই জমাতিয়া একটি কোকবরক ভাষার শব্দ, 'জমা' কথার অর্থ রাজস্ব আর 'তিয়া' কথার অর্থ মকুব। অর্থাৎ যাদের রাজস্ব মকুব করা হয়েছে। এই জমাতিয়ারা একসময় উদয়পুরের মাণিক্য রাজাদের সৈন্যবাহিনীতে কাজ করতেন। রাজ আনুগত্যের জন্য এদের কর মকুব করে দেওয়া হয়। জমাতিয়া লোককথা অনুসারে বুরবুরিয়ার রাজা ছিলেন 'চিচিং ফা' । অনেক ঐতিহাসিকের মতে ইনি রাজা অমরমাণিক্য । মগেদের আক্রমণে তিনি প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। ধনরত্নের নিরাপত্তার ব্যাপারে তার উদ্বেগ আরো বাড়ে। তিনি তখন গোমতী নদীর গতিপথের একটা গুহাতে তার সব ধনসম্পদ লুকিয়ে রাখেন, প্রহরী রাখেন দেবী চক্রাকমাকে। মৃত্যুর সময় মেয়ে ও জামাইয়ের হাতে একটা নকসা দিয়ে ধনসম্পদের কথা জানান। কিন্তু মেয়ে ও জামাইকে বারবার সাবধান করে দেন সময়ের বিষয়ে। সন্ধ্যা হবার আগেই ধনসম্পদ নিয়ে ফিরে আসতে হবে, নচেৎ অনুসন্ধানকারী ব্যক্তি দেবী চক্রাকমার রোষে পড়বেন। আর সেই রোষ অতি ভয়ঙ্কর। "
" অমরমাণিক্য মানে রবিন্দ্রনাথের 'মুকুট' নাটকের অমরমাণিক্য ? " দেবলীনা জিজ্ঞাসা করে।
বিক্রম বলে," ঠিকই ধরেছ। এই অমরমাণিক্যের পুত্র ছিলেন রাজা কল্যাণমাণিক্য। এদের আসল উপাধি 'ফা'। এই রাজবংশকে ফা রাজবংশ বলা হয়। এই ফা রাজবংশের প্রথম রাজা ছিলেন রতনফা বা রতনমাণিক্য। এই বংশেরই রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের সাথে কবিগুরুর হৃদ্যতা ছিল। রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য কবিগুরুর সমস্ত রচনা নিজব্যয়ে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই কাজ বাস্তবায়িত হবার আগেই রাজার প্রয়ান ঘটে। পরে রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের পুত্র রাধাকিশোর মাণিক্যের সঙ্গেও কবির যথেষ্টই সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। "
... চলবে

0 Comments