কবি সৌমিত বসুর কাব্যগ্রন্থ “ডানার আনন্দরঙ্" সম্পর্কে কবি তৈমুর খান কী বললেন

জীবনের প্রখর দীপ্তি ও প্রাচুর্যের আবিষ্কার  //  তৈমুর খান


জীবনের প্রখর দীপ্তি ও প্রাচুর্যের আবিষ্কার  //  তৈমুর খান 

-----------------------------------------------------------------------

কারা আমাকে কবিতার বই দিয়েছিল? 

এই সমুদ্রের কিনারায় দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে দু একটা মুক্তো পেয়ে যাই। অনেক ঢেউ। অনেক বিস্মৃতি। অনেক হারিয়ে যাওয়া। তবু মাঝে মাঝে হৃদয় তুলে নেয় আর এক হৃদয়কে। সম্মোধন করে। 

কবি সৌমিত বসু একবার দিয়েছিলেন “ডানার আনন্দরঙ্" ইসক্রা, কলকাতা ৭০০০০৯ থেকে ২০১৪ সালের প্রকাশিত বই। ৮০ পৃষ্ঠার বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে কবি কত সহজে একটা জাদু ভুবনের চাবি তুলে দিয়ে অবচেতনের স্বয়ংক্রিয় ভ্রমণে পাঠিয়ে দিতে পারেন। বাস্তব জীবনের কলুষতা, বিবর্ণতা, ধ্বংস ও বিচ্যুতিকে দর্শনের উঠোনে দাঁড় করিয়ে একটা একটা করে শব্দের সিঁড়ি নির্মাণ করে পাঠিয়ে দিতে পারেন দুর্জ্ঞেয়লোকের রহস্যময় গভীরে। অনুভূতির তীব্রতায় এমনই ক্রিয়াসংযোগ ঘটান যে কল্পনাও বাস্তবের অংশ হয়ে ওঠে। চিত্রকল্পের সন্নিধানে জুড়ে যায় প্রবৃত্তি ও প্রত্যয়ের বিনম্র স্বীকারোক্তি। পাঠক, পড়েছেন তাঁর কবিতা? 
কয়েক লাইন পড়ুন :

“আমার শবদেহ ঠোক্কর খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে 
সঙ্গে দুজন বিধবা। 
পিঠে নিয়েছিল যারা প্রত্যেকের কাঁধ বেঁকে গেছে 
দূর থেকে দেখেছিল যারা প্রত্যেকেই হয়ে গেছে অন্ধ ইদিপাস 
যে যে তারাগুলি পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল প্রচ্ছন্ন আঁধারে 
একটি মৃত্যুর সাথে তারাও কীভাবে যেন অন্তঃসত্ত্বা, কেউই জানে না। 
শুধু দুজন সম্বলহীন বিধবা পথে পথে নখে রক্ত তুলে এগিয়ে চলেছে"
              (অপেক্ষা) 

একটা ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠলেও চোখের বিস্ময় জেগে ওঠে অন্তরের বৃহৎ ভাবনার স্তরগুলিতে । যা মানবীয় অনুজ্ঞার প্রশ্রয়ে সেজে ওঠে। যার আবেদন আবহমান কালের প্রেক্ষিতে গড়ে উঠেছে। 
  নিজস্ব বোধের দরোজায় উপনীত হয়ে বার বার কবি যখন নিজের কথাই বলতে চেয়েছেন, তখনও পৃথিবীব্যাপী সব মানুষের কথাই হয়ে উঠেছে। পূর্বসূরী যেন উত্তরসূরীদের বলে যাচ্ছেন :

"শরীরের সমস্ত ধাতু আগাছা ভেবে মেলে রাখছি উঠোনে 
একদিন এই পথে উড়ে যাবে আমার সন্তান 
ভোরবেলা চোখ না মেলা আত্মীয়স্বজন পায়ের পাতা চিনে 
খুঁজে নেবে তাদের প্রশ্রয়।" 
                                                       (গতি) 

ঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখেই প্রত্যেকটি মানুষই ঐতিহ্য হয়ে উঠতে চায়। কবিও সেই পথেই অগ্রসর হতে চেয়েছেন। বাল্যকাল তাই ফিরে ফিরে আসছে। আবার জন্মান্তরও মৃত্যুর পর নতুন গতিসঞ্চার করছে। কবি দার্শনিক এবং সত্যসন্ধানী দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেন :

“এক একটি নদী তার হারানো গতিপথ থেকে 
কেবলই হাত নাড়ছে ইশারায়"
                                         (দৃষ্টি) 
জীবন মৃত্যুর পরও নতুন জীবনের ভেতরে বেঁচে থাকে। তার অনিঃশেষ বাঁচার প্রক্রিয়াটিকেই সৌমিত বসু কবিতা করে তোলেন। তাঁর গল্পের মর্মকথাই হল জীবনের প্রখর দীপ্তি ও প্রাচুর্যের আবিষ্কার। তাই কবিতায় গল্প আছে, আবার গল্পের দার্শনিক ভিত্তিও আছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক ঘোরের ভেতর নিঃসঙ্গ চেতনার দৌড় কবিকে মহাপ্রজ্ঞার আলোকসাম্যে পৌঁছে দিয়েছে। তাই প্রকৃতি ও প্রেমের রূপান্তরকে নিজ মহিমায় নির্মাণ করে নিতে পেরেছেন :

"যতবার পারো ভেঙে দাও 
আমি ঠিক জুড়ে জুড়ে একদিন তোমায় জেতাবো। 
                                    (যাওয়া মানে যাওয়া নয়) 

সত্যিই তাঁর দৃঢ়তার দৃপ্ত উচ্চারণ বাংলা কবিতার স্বরকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। পাবলো পিকাসোর কথাতেই বলতে হয় “Everything you can imagine is real.
(Pablo Picasso) কল্পনাটাও তো বাস্তব। কারণ তা জীবনেরই সোপান থেকে মর্মরিত বিন্যাস মাত্র। “ডানার আনন্দরঙ্" নামকরণের মধ্যে দিয়েই এই অভিব্যক্তির পর্যায়টি নির্ণীত করেছেন শিল্পী ঠাকুরদাস চট্টোপাধ্যায় । বইটির মূল্য ১০০ টাকা। 

Post a Comment

0 Comments