অমোঘ জীবনের গান // তৈমুর খান
কবি অসিকার রহমান এর সাম্প্রতিক এক ফর্মার কাব্যগ্রন্থ “সেই লোকটা"(২০১৮) আমার হাতে এসে পৌঁছেছে। কাব্যের বারোটি কবিতায় কবির জীবনদর্শনের অভিমুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অসিকার রহমান বরাবরই কাব্যের নিরীহ ও নিভৃত উচ্চারণের মগ্ন পথিক । আবহমান জীবনের প্রশ্রয় থেকেই তাঁর কবিতা। প্রশ্ন ও প্রেমের রূপান্তরকে তিনি উপলব্ধি করেন, কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীর মতো সমাধান দিতে চান না। যা আছে, যা নিজস্ব ক্রিয়ায় অনুধাবনযোগ্য তাকেই তিনি নিবেদন করেন। বিবৃতির বাহুল্য ও গিমিকের জটিলতা তৈরি করেন না। তাই তাঁর কবিতায় চমক নেই, অন্তঃশীল প্রজ্ঞার অনুরণন শোনা যায় মাত্র।
“সেই লোকটা" কাব্যের নামকরণ যে কবিতাটি দিয়ে তার শুরুই করেছেন “শূন্য শরীরে সে হেঁটে যায়" বলে। এই শূন্যতা নাথিংনেস্ বা এম্পটিনেস্ নয়। এই শূন্যতা ব্যাপ্তির, বিস্ময়ের, কল্পনার এবং জীবনযাপনের স্মৃতিময় বিস্তৃত পরিধির । তার বাস্তবতাও আছে পৌষপার্বণের পিঠে সেঁকা উদাসী রোদের উপলব্ধিতে । বুক জুড়ে ঘামের গন্ধে শ্রাবণী জল ঝরে পড়ায় । আবার অপত্য মায়ার ঘোরেও তার বন্ধন উপলব্ধি করা যায়। আদিমতার প্রত্ন সম্মোহনেও সে উদ্ভিন্ন।
কিন্তু এহ বাহ্য, জীবনের পূর্ণতা যে শূন্যতায় —তার অপরিমেয় বিন্যাসে সে প্রেমের ক্ষেত্র রচনা করে অলৌকিক উদাসীনতায় তা কবি বলতে ভোলেন না :
“সে কি জানে এই দীর্ঘশ্বাসের শূন্যতায় তবু লেপ্টে থাকে প্রেম, এক অবিচ্ছেদ্য মায়া।"
শূন্য হয়ে পূর্ণের কাছে যাওয়ার গতিবিধিই সর্বার্থে অসিকারকে কবি করে তোলে। এ এক সমর্পণ হলেও অভিমান :
“শূন্য আমি এক মহাশূন্যস্থান"
আসলে নাথিংনেস্ বা এম্পটিনেস্এর পর্যায়ে কবির অবস্থান স্পষ্ট করে তাঁর অস্তিত্ব সন্ধানের নিরন্তর অভিক্ষেপকে । জ্যাকসন পিয়ার্স তাঁর “ফ্যাথমলেস" (গল্পের পুনর্বিবেচনা)-এ বলেছেন :
“ It is beautiful, it is endless, it is full and yet seems empty. It hurts us."
Jackson Pearce, Fathomless (Fairytale Retellings, #3)
অর্থাৎ এটি সুন্দর, এটি অন্তহীন, এটি পূর্ণ এবং তবুও খালি মনে হচ্ছে। এটা আমাদের কষ্ট দেয়। এই কষ্টের কাছেই আমাদের দায়বদ্ধ করে তুলেছেন কবি। স্বয়ংক্রিয় এক অভ্যাসে আমরা চালিত হই। আর কবিও তাই না বলাকেও কবিতায় সত্য বলে মনে করেন। স্বীকার করেন :
“কবিতার শরীর জুড়ে অমীমাংসিত খেলা"
এই খেলার শেষ নেই। কখনও জোয়ার, কখনও ভাটা। লুকোচুরি চলতেই থাকবে। সভ্যতার বিষাদময়তায় জেগে উঠেছে লোভ রিরংসাও। সেটাই “ডেড লাইন"। কবি দেখিয়েছেন :
ধর্ষিতার দেহ = হরিণের মাংস
গল্পটুকু যেভাবে তৈরি হয়েছে তাতে ঐশ্বর্যের অহংই বেশি। তবু এক সহজিয়া মন ভিজে গেছে কবির যখন প্রেম বরফ হয়ে গলে গেছে ইচ্ছার গতিসঞ্চারে। সমূহ পরিচয় পেয়েও কবি এড়িয়ে যেতে পারেননি। অলীকের নিসর্গের রহস্যে প্রবেশ করেছেন :
“অলীক এক আলো-আঁধার খেলা করে"
এই আলো-আঁধারের অস্পষ্টতা থেকেই কবির অন্ধ পরিক্ষেত্র রচনা । অমোঘ জীবনের গান তিনি শুনতে চান। সব মিলিয়ে এই তীব্র এক মানবিক আবেদন কবির।গদ্যের চালে প্রতিটি কবিতাতেই একটা রূপকের অন্তরাল গড়ে উঠেছে।
*সেই লোকটা : অসিকার রহমান, বোধিসত্ত্ব প্রকাশন, কলকাতা ৭০০১২৭, মূল্য ৩০ টাকা।


0 Comments