প্রগতির গতি // অভ্র ঘোষাল


1546


এই পৃথিবীর বুকে মনুষ‌্য জন্ম প্রাকৃতিক বিবর্তনের ভিন্নতর রূপরেখায় নিহিত সমৃদ্ধির প্রকাশনায় অন্যতম শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পেয়েছে। পরিবর্তিত সামাজিক কাঠামো, বিকশিত সভ‌্যতার অনিবার্য পরিণাম স্বরূপ মানুষ হয়ে উঠেছে বিশেষত্বের কান্ডারী। কিন্তু, মানুষের এই যে বিপুল প্রগতি, তার নিবিড়ে কিন্তু নিহিত ছিলো 'দ্বন্দ্ব' ; প্রবল 'দ্বন্দ্ব'।


আমরা বরাবরই জানি কলমের সঙ্গে কাগজের সম্পর্কটা দ্বন্দ্বময়। আমরা জেনেছি যে কলম এবং কাগজের সংঘর্ষ বাদ দিয়ে আমাদের পক্ষে লেখার কাজটা সম্ভব নয়। তাই বলাই যায়, এই 'দ্বন্দ্ব'নামক শব্দটার জন্মই হয় দ্বন্দ্বের মধ‌্য দিয়ে।


যদি আদিম যুগের দিকে ফিরে দেখা যায়, তাহলে দেখতে পাবো প্রথম দিকে আমাদের পূর্বপুরুষগণ আগুন সম্বন্ধে অবগত হয়নি। মানব সমাজ বছরের পর বছর অনুভব করেছে শীতের রাতের অসহ‌্য কাঁপুনি। কাঁচা মাংস ছিন্ন করে করে পাচনতন্ত্রের জ্বালা মিটিয়েছে মানুষ। ইতিমধ‌্যেই হয়তো পাথরে পাথর ঘষে ঘষে আচমকা স্ফুলিঙ্গ দেখেছে কোনও এক আগ্রহী ব‌্যক্তি।


ক্রমে ক্রমে ওই ব‌্যক্তিটি তার এই নব‌্য আবিষ্কারটি ছড়িয়ে দিয়েছে তার সমাজের অন‌্যান‌্য বাসিন্দাদের মধ‌্যে। তবে হ‌্যাঁ, একটা প্রশ্ন মাথায় আসতেই পারে যে, এখানে দ্বন্দ্বের ভূমিকাটা কী? উত্তরটা একটু সহজ ভাবে বলা যাক। ওই সুশীতল রাতগুলোর কাঁপুনি অনুভব করার মধ‌্য দিয়েই মানুষ আর প্রকৃতির মধ‌্যে দেখা দিচ্ছে তুমুল দ্বন্দ্ব। মানুষের চামড়া ভেদ করে, ছুঁচের মতো তার রক্তে যে প্রকৃতি মিশিয়ে চলেছে শীতলতা, সেই প্রকৃতিই কিন্তু মানুষকে ভাবাচ্ছে আর দ্বন্দ্বে লিপ্ত করাচ্ছে। কাঁচা মাংসের স্বাদ আবার মানুষকে দ্বন্দ্বের সম্মুখীন করে তুলছে।


এবার তার সহজীবদের সাথে দ্বন্দ্ব মানুষকে ফের ভাবাচ্ছে। পাথরের সাথে দ্বন্দ্ব জন্ম দিচ্ছে আগুনকে, আর সেই আগুন মানুষকে ঠেলে নিয়ে চলেছে অগ্রগতির দিকে। বস্তু-জগতকে চিরকালের জন‌্য পাল্টে ফেলছে এই 'দ্বন্দ্ব' নামক প্রপঞ্চ। প্রত‌্যেকটা দিনে, প্রত‌্যেকটা মাসে, প্রত‌্যেকটা বছরে এই বস্তু জগৎ বদলে যাচ্ছে। আর এভাবে মানুষের আবর্তের সঙ্গে দ্বন্দ্বের ঘষা লেগে লেগে বদলাচ্ছে তার চিন্তার স্তর, বদলাচ্ছে দর্শন, লুপ্ত হচ্ছে যা কিছু "আদিম"।


কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মধ‌্যে সব থেকে "প্রাচীন" বা "আদিম" যে বস্তুটি, সেটি হলো মানুষের যৌনতা সম্বন্ধিত জিজ্ঞাসা এবং কৌতূহল বা এক কথায় 'sexual sixth sense'। আর আমাদের এই সমাজকেন্দ্রিক জনজীবনে বরাবরই আলোচিত হয়েছে পুরুষ এবং নারীর পৃথক পৃথক পরিচয় বা যাকে বলা হয় 'sexual dimorphism'।


আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মতাদর্শের দিক থেকে পিতৃতন্ত্রকে আধিপত‌্য কায়েম করতে দেখা গিয়েছে এবং সেই লক্ষ‌্যে যাবতীয় পুরুষালী প্রয়োগ পিতৃতান্ত্রিক ব‌্যবস্থায় নারীকে কার্যত সমস্ত সদর্থক ভূমিকা পালনের জায়গা থেকে বঞ্চিত করেছে। যৌন পরিচয় এবং দৈহিক গঠনের পার্থক‌্য পিতৃতন্ত্রকে উদ্বুদ্ধ করেছে পুরুষকে জীবনস্রোতে মূল চালিকাশক্তি হিসাবে তুলে ধরতে।


যদিও দীর্ঘ সংগ্রামের মধ‌্য দিয়ে পুরুষতান্ত্রিক দম্ভ ও অহঙ্কারকে ভেঙে দিয়ে সমানাধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে নারীরা ( যদিও পুরুষ প্রধান মানসিকতার সম্পূর্ণরূপে অবসান ঘটেছে সর্বত্র এ কথা বলা যায় না )। আসলে দিনের পর দিন সমাজটা hypocrite হয়ে উঠছে। খুব ভালো ভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, সমাজে যা কিছু এখন স্বীকৃত, যা কিছু ধর্ম-অধর্মের নামে চলছে তার সঙ্গে সংস্কৃতি আচার-আচরণ সভ্যতার বিরোধ থাকলেও যৌনতার নেই ।


এই কলকাতা শহরে মানুষে মানুষে ঠাসাঠাসি। জীবন বয়ে চলেছে অশ্ববেগে। এর ফলে সামাজিক সম্পর্কগুলো ঠেকেছে তলানীতে। কোনো বিশেষ কারণ ছাড়া একের অপরের বাড়ি যাওয়া প্রায় হয় না বললেই চলে। হয় কোনো community hall-এ নইলে কোনও club-এ দেখা হয় একের অপরের সঙ্গে । কিন্তু সেই সম্পর্ক সুতোয় ঝুলন্ত, যে কোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যেতে পারে।


এতোটা কম সময়ের মধ‌্যে মানুষে-মানুষে এই দেখা হওয়ার মধ‌্যে আন্তরিকতা থাকে না। থাকে কেবল ওই hypocrite সৌজন্য। E-দুনিয়া আর social media-নির্ভর সম্পর্কের এই যুগে মানুষ কিন্তু খুবই একা। তার এই নিঃসঙ্গতা দূর করার উপায় তবে কী ? আজ থেকে বছর-কুড়ি আগেও মানুষের জন্য ছিল নানান ধরনের সামাজিক আয়োজন ।


ছিলো অনুষ্ঠান আর আড্ডার ছড়াছড়ি। তখন যেসব সাংস্কৃতিক সংগঠন আমাদের মনোজগত নিয়ন্ত্রণ করত তাদের আদর্শবোধ ছিল অনুকরণীয়। এখন কি সেই সব আছে? একাকিত্বের এই আলো-ছায়ায় মনের মধ‌্যে বাড়ছে লালসা। আর সেই লালসা বা 'lust' নারী দেহ ছাড়া কিছুই বোঝে না। আর এখানেও সেই পূর্বকথিত 'দ্বন্দ্ব' নামক শব্দটির আগমন হয়। এই দ্বন্দ্ব মনের সঙ্গে বিবেকের দ্বন্দ্ব।


কিন্তু ওই যে dimorphic sexual pattern, তার তো কোনও বদল হয় না ; প্রত‌্যেকটি পুরুষের অবচেতন মনের মধ‌্যে স্রেফ লুকিয়ে থাকে এবং সুযোগ এলেই প্রকট হয়।
এখন কোনও মানুষই ভোগ এবং উপভোগের তফাৎ বোঝে না । ভোগ মানে যে জোরজবরদস্তি নয়, সেটা তারা ভুলে গিয়ে এমন কাজ করে যাতে তাদের বাকি জীবনটাও মাটিতে মিশে যায় । আর যে নারী বা মেয়েটি এই সব কিছুর শিকার হয়, আমি তাদের হয়ে কথা বললেও প্রশ্ন করতে চাই, আমরা তো জানি নারীই পারে চোখের ভাষা পড়তে।


তারা কাঁধে হাত পড়লেই বুঝে যায় কোনটা কামনার আর কোনটা ভালোবাসার। সে নারী কেন এতো সহজে আজ ধর্ষণের শিকার? তাদেরও কি কোথাও ইন্ধন আছে? কাজ করছে উগ্র লোভ বা লালসার মোহ? বারবার এক একজন এক এক ভাবে ফাঁদে পা দিচ্ছে কেন ? জোরটা হচ্ছে কিন্তু কোনো এক নিরিবিলি জায়গায় যাওয়ার পর।


সেটা কি কোনও পরিবার জানে না ? এই জানা অজানার মূল কারণ কিন্তু সংসারে Social media কর্তৃক তৈরি ফাঁদ। সে এমনভাবে পৃথক করে রেখেছে যে এখন মা-বাবা-ভাই-বোন কেউ কারো খবর রাখে না । রাখার সময় পায় না। ফলে এমন সব অঘটন ঘটেই চলেছে ।যখন ঘটে যায় তখন হা-হুতাশ আর রোদন ছাড়া কিছুই বাকি থাকে না।


--------- ( অভ্র )













Post a Comment

0 Comments