স্বপ্নের দেশে // শুভ্র ঘোষ

গত কয়েকদিন গণতন্ত্রের উৎসব উপলক্ষে আমাদের পাড়ার গাছে, দেওয়ালে অনেক ছবি টাঙানো হয়েছিল। উৎসবের দিন অঞ্জলী দিয়ে প্রচন্ড গরমে, ছবি গুলি দেখতে দেখতে ক্লান্ত শরীরে, বাড়ি ফিরেছি। ফেরার পর বিশ্রাম নিতে নিতে চোখ দুটি প্রায় বুজব বুজব করছে; এমন সময় কোথা থেকে একটি রাজহাঁস এসে আমাকে বল্ল, "চল। পায়ে নাগড়াই গলিয়ে নগরে গিয়ে, একটু রগড় দেখে আসবে চল।"


 খুব ইচ্ছা না থাকলেও,বেড়িয়ে পড়লাম। ভাবলাম, যাব তো ওর পিঠে বসে। তাই 'রগড়' দেখার ইচ্ছায় ক্লান্তিকে দূরে সরিয়ে, উঠে পড়লাম, ওর পিঠে। উড়তে উড়তে শহরে এসে তো অবাক!!  কেন জান? শোনো তাহলে কি কি দেখলাম।


 রাজস্থান শহরে- এক মেয়ের বাবাকে দেখলাম, তাঁর মেয়ের বিয়েতে পণ স্বরূপ পাত্রপক্ষ কে এক কানাকড়ি ও পণ দিতে রাজী হলেন না। অবাক!!  রাজহাঁস কে বল্লাম। যাক,অন্ততঃ পণের টাকা যথাযথ না পাওয়ার অপরাধে কোনো মেয়েকে আর বরের মানে শ্বশুর বাড়ির অত্যাচার সহ্য করতে হবে না।  মন কেমন ফুরফুরে হয়ে গেল। এরপর যখন দিল্লী রাজ্যের উপর দিয়ে যাচ্ছি, দেখি, সে রাজ্যে সমস্ত পুরুষ কাজে ছুটি নিয়ে, সকাল সকাল মিছিলে হাটতে বেড়িয়েছে। তাদের হাতে ধরা ইশতিহারে লেখা; 'একটা মেয়ের পোষাক যেন কখনোই তার অপমানের কারণ না হয়।নির্ভয়া নয়।নির্ভয় চাই...'।


 বিশ্বাস করবে কি না জানি না। তবে সত্যি বলছি,এসব দেখে মনে হল, এবার হয়ত মেয়েরা রাত করে বাড়ি ফিরলে বাড়ির মানুষ গুলোর কোনো ভয়, চিন্তা কাজ করবে না।


উড়তে উড়তে রোদের তাপে জন্মানো তেষ্টা পালনের উদ্দেশ্যে পাঞ্জাবের এক ধাবায় নামলাম। সেখানে লস্যি গিলতে গিলতে শুনতে পেলাম। এক দাঁড়িওলা এক পাগড়িওলা কে বলছে - জান,গত রাতে সিং-জী'র মেয়ে অফিসের এক বান্ধবীর বাড়ি ছিল।রাতে বাড়ি ফিরতে পারেনি।তবে বাচোঁয়া যে আগের মতন আর অশান্তি হয়নি। পরের দিন সকলের সামনে দিয়ে মাথা উঁচু করে ঘরে পা রেখেছিল সে। সিং-জী ও আগের মতন বকাবকি করেননি।


শুনতে শুনতে সময় চলে যাওয়ার ঈঙ্গিত পেতেই, আবার রাজহাঁসের পিঠে বসে উড়ে পড়লাম আকাশের উদ্দেশ্যে।


যখন বিহার রাজ্যের উপরে তখন রাজহাঁস বলল 'জান কি! এখানে এখন কোনো একজন নারী তাঁর বাচ্চাকে একাই মানুষ করতে হলে,সে নিশ্চিন্তে করে। তাঁর পাড়া-প্রতিবেশী তথা অপরিচিত পরিচিত বন্ধু বান্ধব মহলে কথাও শুনতে হয় না। কথাটি শুনে, ভেবে অবাক হওয়ার থেকে বেশী অবাক হলাম এই ভেবে, যে রাজহাঁসটাও দেখছি আজকাল বেশ খবর রাখে। ভাল।বেশ ভাল।


তবে এর থেকে বহু বেশী আশ্চর্য্য হলাম, উত্তরপ্রদেশের অবস্থা দেখে। কে বলবে একসময় সেখানে যা দেখেছিলাম,আজ তার বিপরীত পরিবেশ।সেখানে এখন, 'এই কেউ বুঝি ক্ষতিকারক কিছু ছুঁড়ে মারল গায়ে', এমন ভেবে কোনো মেয়ে ফাঁকা রাস্তায় চলতে আর ভয় পায় না। পরিবেশ পাল্টে গেছে। দেখে শুনে কি যে ভালো লাগছিল বলে বোঝাতে পারব না ।মাথায় সারাক্ষণ শুধু, "এত্ত পরিবর্তন! এও সম্ভব!সত্য যুগ কবে এল?" এসব কথা ঘুরে বেড়াতে লাগল...


  অনেক ক্ষণ ঘুরতে ঘুরতে অনুভব করলাম, বন্ধু রাজহাঁসের পিঠে ব্যাথা ধরেছে।তাই একটা পুকুর ধারে তাকে বিশ্রাম নিতে বসিয়ে,নিজেই ঘুরতে বেরিয়ে পরলাম।


চলতে চলতে, শুনতে পেলাম। কোনো এক গ্রামে, এক মাটির  ঘরের ভিতরে এক নারী এক পুরুষ কে বলছে, "শুনেছো!নতুন আইনের ফলে এখন আমাদের মেয়েকে পড়ার মাঝেই পড়া বন্ধ করতে হবে না। আর হ্যাঁ; আগেই বলে দিচ্ছি ও ইস্কুল যাওয়া শুরু করলে ওই পনেরো বছরের বড় লোকের সাথে ওকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে দেব না কিন্তু..."


সত্যি বলছি;এ ঘোর কলিতে এমন কথাও যে কানে আসতে পারে,তা কল্পনারও বাইরে। এমন সময়ে শব্দ হল, ছলাৎ!!


ভিজে জামা-কাপড়ে বসে আছি। এমন সময়ে হাঁস বাবাজীর কথা মনে পড়তেই চোখ খুলে দেখি, মা বালতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে...স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল!! 


মাকে জানালাম, স্বপ্নের কথা। সন্ধ্যে সাতটা বাজে। "আর কত ঘুমাবি,এবার তুইওকি রা জেগে দেশের চৌকিদারী করবি"। বলে গামছা আমার হাতে দিয়ে বল্ল: "তোর স্বপ্ন কে অনুভব করতে পারছি রে।তবে কি জানিস।তুই যা দেখেছিস সেটা অসম্ভব বা অবাস্তব না।


শুধু এইসময়, সেই সু-সময় না। সেই সময় না আসা পর্যন্ত নারী পুরুষ বিভেদ চলবেই।যেদিন কোনো মহিলা, বাসে বা ট্রেনে উঠে একজন পুরুষ কে মহিলা সিট থেকে ওঠানোর বাহানায় বলবে না, "দাদা এটা 'মহিলা সিট', উঠুন"। কিংবা ভুল বসত কোনো পুরুষ রেল গাড়ীর মহিলা কামরায় উঠে পড়লে তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া হবে না।


যেদিন,নারী-পুরুষ উভয়েই নিজেদের লিঙ্গ-ধারণার বাঁধন ভেঙ্গে ( একজন মহিলা নিজেকে শুধুমাত্র নারী হিসেবে ভাবা এবং পুরুষ নিজেকে শুধুমাত্র পুরুষ হিসেবে ভাবা বন্ধ করে... ) নিজেদের মানুষ ভাববে। যেদিন,একটি দিনের বিলাসিতা দে খানোর আগে,মানুষ সারা বছরের দায়িত্ব নেবে। সেদিন যুগান্তর ঘটবে। কলি যুগের অবসান হয়ে সত্য যুগের আগমন ঘটবে"।


মায়ের কথা শুনে ঘড়ির দিকে দেখলাম; আটটা বাজে। মনে মনে ভাবলাম; "উঠে পড়ি বারোটা বাজতে এখনো সময় বাকী আছে..."


Post a Comment

0 Comments