.
.
আবু রাইহান এর কবিতা পড়তে পড়তে বার বার মনে পড়ছিল নিকোলা অ্যান এর The Universe at Heartbeat এর সেই অমোঘ বাণীটি “We are a puzzle meant to be arranged" সব আয়োজনই একটি ধাঁধা। প্রেমের আয়োজন যে ধাঁধাই একথা প্রেমিক মাত্রই জানেন।.
আর সেই কারণেই আবু কাব্যের নামও রাখেন “সংকেতময় বিস্ময়" (প্রথম প্রকাশ বইমেলা ২০১৯)। কাব্যের প্রতিটি কবিতাতেই কবির আর্তি, ক্ষরণ, কষ্ট ও বিপন্নতার এক একটি নিদর্শ গীতল সন্নিধানে মুক্তির দিশা পেয়েছে। কবি সরাসরি সেকথাই বলেছেন :
“প্রতিদিনই গোধূলি সন্ধ্যার
উদাসীন বিপন্নতায়
অনুভবে জেগে ওঠে
নিজস্ব বিপন্নতা।"
.এই বিপন্নতা আত্মযাপনের বহুমুখ অন্বয় ও অনন্বয় নিয়েই রচিত হয়েছে কবিতাগুলিতে। ধ্বনিময় শব্দার্থের বিন্যাসে অক্ষরবৃত্তের রূপ পেয়েছে। ভালোলাগার মুহূর্তগুলি থেকে শূন্যতার অভিক্ষেপ ব্যক্তিহৃদয়কে যেমন ক্ষতবিক্ষত করেছে, তেমনি সর্বব্যাপী অনুরাগের গভীর উষ্ণতায় রঙিনও করেছে। প্রবল আত্মশক্তির জাগরণ যেমন ঘটেছে, তেমনি একান্ত নিবেদনে সম্মোহনের বাতাবরণও তৈরি করেছে।
.
নৈঃশাব্দ্যিক আলো-অন্ধকারে অতীতচারী কবি বর্তমানে পদার্পণ করেও সদর্থক প্রজ্ঞায় এক সংবেদনশীল প্রত্যয়ের কাছেই পৌঁছে গেছেন। তাই প্রেমের দহনে দহিত হয়েও অমৃতের সন্ধান করেছেন। মৃত্যুও ভয়ংকর রূপে ধরা দিলেও আত্মসমর্পণে সুন্দর হয়ে উঠেছে । সংযমী কবি কখনও সিয়ামের ব্যত্যয় করেননি । প্রেম শরীরী আশ্লেষে কামগন্ধময় হয়েও অপার্থিব ঐশ্বর্যে আলোক দীপ্তির প্রাচুর্যে নবরূপায়ন লাভ করেছে। কবি বলেছেন :
.
“জাগে ভিন্নতর অনুভূতি
অপার্থিব আহ্বান শুনে
অন্তরাত্মায় অনুশোচনা ও ভয়
বোধের অনুভবে মনে হয়
এই বেঁচে থাকা বড় মায়াময়।"
.
“বিশুদ্ধ ভালোবাসানামা" লিখতে গিয়ে তো এখানেই কবির সার্থকতা। ব্যক্তিকেন্দ্রিক ঘোরের ভেতর নিঃসঙ্গ চেতনার পর্যটনে কবি অপার্থিব ঐশ্বর্যের মগ্নতা আদায় করে নিতে পেরেছেন। প্রেমের রোমাঞ্চকর উপকূল থেকে মায়াময় কামনার লালায়িত ঢাল সর্বব্যাপী সমাপতনে গভীর অন্বেষা যা চিরন্তন প্রেমের পাঠকেই নিরীক্ষণ করে। কমণীয় রাত্রির আশ্চর্য ভোরে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। কবি বলেছেন :
“স্বজন বেষ্টিত আমি, প্রশান্তির ঘোর
ভৈরবী সুরের মূর্ছনা, নৈঃশব্দ্যের ভোর।"
.
তখন তো উইলিয়াম সেক্সপীয়রের সেই কথাটিই মনে পড়ে :
“Love all, trust a few, do wrong to none." সবাইকে ভালোবাসো, কয়েকজনকে বিশ্বাস করো, কাউকে ভুল করো না। এই ব্যাপ্তিই তো সদর্থক প্রত্যয়ের ভেতর দিয়ে কবিকে যুগোত্তীর্ণ করে তুলেছে। যে প্রেমের মন্ত্র রমণীর মুগ্ধ রমণে জেগে উঠেছে, সেই প্রেমই শুচিতার ঐশ্বরিক প্রজ্ঞায় শেষ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পেরেছে স্বর্গীয় বিভাসে। কবি তাই কাব্যের শেষ পর্যায়ে এসে লিখছেন :
.
“এক অনাস্বাদিত বেহেশতের আকাঙ্ক্ষায়
জারিত হয়ে যাচ্ছে আমাদের হৃদয় মন
মোনাজাতের জন্য উত্তোলিত হাত, আর
আল্লাহর প্রতি সমর্পণের আর্তি অশ্রুতে
নরম আর বিশুদ্ধ হচ্ছিল মন"
.
এই বিশুদ্ধ মনই আত্মক্ষরণের নির্বেদ অভিঘাতে আত্মসমর্পণ সম্পন্ন করেছে। শান্ত আর্দ্র এবং সারল্যতায় ভরা কাব্যগ্রন্থটিতে মানবীয় আবেগকে ঐশ্বরিক আবেগে রূপান্তরিত করার এবং প্রেমকে মাহাত্ম্যের আলোয় উজ্জ্বল করে তোলার বৈশিষ্ট্যটিই ধরা পড়ে। অভিজিৎ রায় এর প্রচ্ছদ সংকেতের বিস্ময়কেই তুলে ধরেছে। ঙ্ক্ষা ও ণ বর্ণ দুটির সঠিক ব্যবহার হয়নি। ফলে ভুল বানান বেশ পীড়াদায়ক।

0 Comments