বুক রিভিউ : মুহম্মদ মতিউল্লাহ এর নির্বাচিত কবিতা


https://www.sahityalok.com/
কবি মুহম্মদ মতিউল্লাহ তাঁর কাব্যগ্রন্থে স্বাক্ষর করছেন



মুহম্মদ মতিউল্লাহর কবিতা মায়াময় আসক্তির অনবদ্য সেলফি 

তৈমুর খান 

 
মুহম্মদ মতিউল্লাহর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “অন্নজলে ভালোবাসায়” বের হয়েছিল ১৯৮৭ সালে কবির ২০ বছর বয়সে। তখনই কবি “মানুষের জীবনের মতো পূর্ণতা পেতে চাই” আকাঙ্ক্ষায় জারিত হয়েছিলেন। তারপর একে একে “শোনো জন্মান্ধ যুবক”, “নক্ষত্রের কুকুর”, “আপাতত হস্টেলে আছি”, “আকাশ বলছে, না”, “ও পলাশ, ও করবী”, “ঈশ্বরের পদাবলি ঘিরে নম্র ধূসরতা”, “সাঁওতাল কবিতার চয়ন থেকে”, “হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ”প্রভৃতি ২০১৬ পর্যন্ত ৯ টি কাব্যগ্রন্থ থেকে কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “নির্বাচিত কবিতা”(২০১৮) ।
 
 
সাহিত্যের বহুমুখী দিগন্তের অভিসারী  হলেও মতিউল্লাহ কবিতার কাছেই এক আত্মিক নিভৃতির অভিক্ষেপ বপন করেছেন। এক মায়াময় আসক্তির অনবদ্য সেলফি হয়ে উঠেছে কবিতাগুলি। আকাশ, মাটি, ঈশ্বর ও প্রকৃতির সন্নিধি তাঁর সত্তাকে জাগিয়ে তুলেছে। কবি লিখেছেন :
 
“স্তব্ধতার সামনে দাঁড়িয়ে আমি ডাক নাম ধরি 
তার অক্ষর ভেঙে ভেঙে স্রোতস্বিনী তৈরি করছ তুমি 
অদূরে ঘাসবন ছায়া, মায়াবী নক্ষত্র আলো 
অপেক্ষায় আছে স্বস্থ প্রহরের 
তারপর চুম্বনদাগ, তারপর প্রতি ইঞ্চি জেগে থাকা”
                                                          (জাগর ) 
 
এই জেগে থাকাই আলোকিত এবং পুষ্পিত প্রহর হয়ে উঠেছে কবির কাব্যবনে। খুব সদর্থক অভিব্যক্তি যা বিষণ্ণতা ও অন্তরায়কে ভরাট করে দিয়েছে জীবনের প্রগাঢ় প্রেমের উপলব্ধি যার মধ্যে কবি “নিবিড় ঈশ্বরতায় বস্তু বিশ্বকে স্নান” করতে দেখেছেন। 
 
 
 
 
মুহাম্মদ মতিউল্লাহ অলংকার প্রকরণে যথেষ্ট সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর সৃষ্টিকে। দক্ষ শিল্পীসত্তার পরিচয় ছড়িয়ে আছে সমগ্র কাব্যটিতেই। মানবিক রসের প্রশ্রয়েই শব্দবন্ধ আর মেধাবী আলোকসজ্জার প্রখর দীপ্তি প্রবাহিত হয়েছে। যা একজন কবিকে উচ্চতায় পৌঁছে দিতে সহায়ক। 
 
 
     আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত, চেনা জগৎ আর ঈশ্বর পিপাসা আর নিজস্ব নিভৃত অনুভূতিগুলির প্রতিস্থাপন এবং সেইসব যাপনেরই অভিঘাতগুলি কবিতায় তুলে এনেছেন । উপমা, বর্ণনা, ছন্দ, নিখুঁত পরিমিতির ভেতর কবিতায় নিগূঢ় পর্যটন কবিকে সহজিয়া ঘরানার আলোকিত মানুষ হিসেবে চিনিয়ে দেয়। অনবদ্য মার্জিত ও প্রত্যয়ের ভিশন হয়ে যায় তাঁর কবিতা। সহজ শব্দ ও মানবীয় সম্পর্কের টানে কী অসাধারণ তাঁর অনুচ্চ উচ্চারণ :
 
“মা এসেছিল চুপিচুপি কাউকে বলিনি 
বাবা এসেছিল চুপিচুপি কাউকে বলিনি 
তারপর সমাচ্ছন্ন ঘুম 
তারপর বরফের দেশ সূর্যাস্তের পাহাড় 
স্তব্ধ শীতলতা 
বাবা-মা থাকেন মেঘলা আকাশ ঐশ্বরিক প্রবাসে 
 
একদিন আমি যাব”                   
                                                (কাউকে বলিনি) 
 
 
মৃত্যুকেও কত অনায়াসে সরল ও সহজভাবে চেতনায় তিনি লালন করেন তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। প্রতিটি কবিতাতেই এই সহজাত সহজ সারল্যের সাবলীল দ্যুতি ছড়িয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথেও কবি বারবার আশ্রিত হয়েছেন। এক সংবেদনশীল আনন্দের আশ্রয় সেখানে। মানুষের কাছে নম্র সম্পর্কের মধ্যে দিয়েই আত্মদর্শন ঘটেছে কবির। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তেই আমার মনে পড়ে গেল বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক টলস্টয়ের কথা :“There is no greatness where there is not simplicity, goodness, and truth .”
 
এই মাহাত্ম্যের বৈশিষ্ট্য তথা চাবি নিয়েই মুহম্মদ মতিউল্লাহ বাংলা সাহিত্যে বিরাজ করবেন।


https://www.sahityalok.com/

Post a Comment

0 Comments