তাজিমুর রহমান এর কাব্যগ্রন্থ “মাধুকরী তুমি কোন্ পথে" এর আলোচনা।আলোচক :তৈমুর খান

https://www.sahityalok.com/


সহজিয়া অনাড়ম্বর জীবনবোধের কবি তাজিমুর রহমান 



তাজিমুর রহমান সহজ ও অনাড়ম্বর এবং অকপট কবিতায় তাঁর ছায়া নির্মাণ করে চলেছেন। “মাধুকরী তুমি কোন পথে"(২০১২) কাব্যগ্রন্থটি পাঠ করতে গিয়ে মনে হল বড়ো অভিমানী কবি। তাঁর কষ্ট ও নিঃসঙ্গগুলিকে কবিতার ভাষা দান করেছেন। সহজিয়া জীবনের প্রবল ঢেউয়ে নিজস্ব শালীনতাকে রক্ষা করতে করতে তিনি শব্দবোধের মরমিয়া একটি আকাশের সন্ধান করেছেন। “জাতক কাহিনি" কবিতায় লিখেছেন :


“পটলডাঙার পলাশ বলত 
আকাশ, বৃক্ষ, ফুল, নারী নিয়ে 
অনেক কাব্য হল ; হল না যা 
কুয়াশার কথা 
বনতুলসীর গাথা! 
লাজুক হৃদয় এরও পরে 
মাথা খুঁড়ে মরে ; অধিকন্তু 
এসব বিষাদ জানালার কাচে খোদাই করতে গিয়ে 
একাকি বাটালি ভোঁতা হতে থাকে! আর 
পাখির ডানায় মরে আসা রোদ 
প্রণত গ্রীবায় তর্পণ করে জাতক কাহিনি…."



অন্তর্গত বিষাদ তো জানালার কাচে খোদাই করাও যায় না। তা নীরবতার অন্তরালেই শেষ সন্ধ্যায় মিলিয়ে যায়। জাতক কাহিনির নিরন্তর পথে। প্রেমের জন্ম হয়েছে ঠিকই কিন্তু সেই প্রেম কি মৃত্যুরই নামান্তর? কেননা সৌন্দর্যের চোরাবালিতে একদিন ডুবে যেতে হয়েছে সকলকেই। সুতরাং সংশয় বিপন্ন কবি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেননি। শুধু রূপান্তর ঘটেছে। একটা পিঁপড়ে যেমন আর একটা পিঁপড়ে হয়ে যায়, তেমনি কবিও :



“কখন আমিও পিঁপড়ে হয়ে 
তোমাকে জড়াই ; বেহিসেবি প্রেম ছোলা-মুড়ি খেয়ে 
অবিবেচকের মতো জ্যোৎস্না পাঠ করে"
                              (আনমনে) 
প্রাত্যহিকের কঠিন জীবনযাপনে রোমান্টিক অনুভাবনাগুলি কবির কাছে প্রশ্নজীর্ণ। তবু আনমনে যৌবনধর্ম, এমনকী প্রাণধর্মও নিবেদিত হতে থাকে। 

     চারিদিকে চোখধাঁধানো সমারোহ আর প্রলোভনের হাতছানি। প্রকৃতিও সাজিয়ে দিচ্ছে ভোগের ঐশ্বর্য। তবুও “পাখির খাঁচায় বেড়ে ওঠে শুধু বিষাদ" ; মাধুকরী জীবনে কখনোই পূর্ণতা আসে না। মৌন আলাপনে নেমে যায় সকলে। কখনও কখনও “বৃক্ষময় মূর্ত হয় অর্বাক অবিষাদ" যা সাময়িক হলেও গার্হস্থ্য সুখের স্পর্শ দিয়ে যায়। তখন তো কবির চোখেও এক নতুন রূপ পেয়ে যাই :



“বিষাদক্লান্ত প্রহর তখন বরষাসিক্ত রমণীর মতো"

জীবনের অনুপম সারল্যের ভেতর দার্শনিক চেতনাও এক একটি সৌন্দর্যের বিন্যাস হয়ে ওঠে কবিতা। রিক্ত কাঁথায় সুদৃশ্য ছায়া আঁকা থেকে ইলোরা মানবীর ঐতিহাসিক নিদর্শনেও তা প্রত্যক্ষ করা যায়। 


      বাংলাকে তার প্রকৃতির রূপলাবণ্যে চেনা যায়। সবুজ গালিচা, হংসগ্রীবা, উড়ন্ত বকের সারি, গেড়ি-গুগলি আর বালিকা হৃদয়ের স্বপ্নপ্রহরে সেই বসন্তের বাউলকে সুর ঝরাতে দেখি। কবিও তাকে পেয়ে যান :



“যে নির্জনতা মাথা তুলে আছে 
আমাদের মাঝে, অনায়াসে 
তার নাম হোক বাউলভুবন…"
                 (বাউলভুবন) 
ধান, কৃষক, ঘাস, চাঁদ, ফুল ও পাখির সমারোহে মনুষ্য জীবনেরই প্রবৃত্তিগুলির স্ফুরণ ঘটে। ভালবাসা শব্দটি আবার আশ্রম গড়ে এখানে :

“সব ঘৃণা, পাপ ভুলে যেতে পারি 
যদি তুমি এসে হাতে রাখো হাত, 
তুমি কেউ নও, প্রিয় ভালোবাসা" 
           (কেউ নয়, ভালোবাসা) 


প্রিয় ভালবাসা, প্রিয় অভিমান নিজস্ব পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে আবার নিজের কাছেই ফিরে আসে। রোদের কাছে, বৃষ্টির কাছে, মেঘের কাছে, স্তব্ধতার কাছে মাধুকরী হয়। আর এই পথই তো তখন অনন্তের পথ :

“অনন্ত যাত্রাপথে এভাবে সম্পৃক্ত হতে থাকে 
শূন্যতার সরগম। নিভৃত সকল পাঠ মাত্রাহীন এক 
স্রোতে সাবলীল, ৠজু। শুধু ভারহীন জ্যোৎস্নার নৌকা 
হয়ে ভেসে যেতে পারে না মৃত্যুপরগণা…"
                                        (দোসর) 



মাধুকরীর অনন্ত যাত্রাপথে স্পর্শ ও হৃদয়, রূপ ও অরূপ বিচিত্র আবেগ সঞ্চারী আলো-আঁধারিতে মগ্নতার নবরূপায়ন ঘটে। শূন্যতা পূর্ণতার দিশারী পায় । কবিরও জন্মান্তর ঘটে এখানেই। কেননা, শূন্যতাও আর ক্লান্ত করে না। মৃত্যুও বিষণ্ণ করে না। বরং দীপ্ত ও দৃপ্ত করে। আমেরিকান বিখ্যাত লেখক Natalie Angier (1958) এই জন্যই বলেছেন “Eternal love, is a myth, but we make our myths, and we love them to death." অনন্ত প্রেম, একটা মিথ। এই মিথ আমরাই তৈরি করি। মৃত্যুতেও তা মরে না। তাজিমুর রহমান তাঁর ৬০ খানা কবিতায় এই মিথ নির্মাণেরই অভিমুখ রচনা করেছেন। চঞ্চল গুঁই এর প্রচ্ছদ খুব সুন্দর হয়েছে । 







#মাধুকরী তুমি কোন পথে : তাজিমুর রহমান, পত্রলেখা প্রকাশন, ১০ বি কলেজ রো, কলকাতা ৭০০০০৯, মূল্য ৬০ টাকা। 


আলোচক : তৈমুর খান 

Post a Comment

0 Comments