আমি জিনিসগুলো নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলাম। কত রকমারি জিনিস। হাতির দাঁতের বুদ্ধমূর্তি, কাঠবাদাম কাঠের পাইপ, ব্রোঞ্জের ছাইদানি, জেড পাথরের তৈরি ছুরি, আরো কত কি ! কিন্তু সবচেয়ে যেটা নজর কাড়লো সেটা লাল স্ফটিকের তৈরি ড্রাগন। ড্রাগনটাকে নাড়াচাড়া করতে দেখে বুড়ি "নো নো" করতে করতে ছুটে এল। তারপর ছো মেরে আমার হাত হতে ড্রাগনটা কেড়ে নিয়ে বললো," এটাতে হাত দেবে না, এটা বিক্রি নেই।"
আমি জেদ ধরে রইলাম। শেষমেশ বৃদ্ধা আমাকে ড্রাগনটা দিলেন এবং সেটাও একদম সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। ড্রাগনটা পেয়ে আমি যারপরনাই খুশি হলাম, কিন্তু বৃদ্ধা মুখ ভার করে রইলেন। দোকান হতে বেরোবার সময় তিনি বারবার সতর্ক করে দিয়ে বললেন," খুব সাবধানে রেখো। নিজের খুব কাছে রেখো না, খুবই ভয়ানক এটা। সাবধান !" আমিও এই সাবধানবাণীকে পাগলের প্রলাপ ভেবে মনে মনে একপ্রস্থ হেসে নিলাম।
এরপর হতেই শুরু হলো একের পর এক অঘটন। একদিন সকালে দেখলাম আমার পোষা বেড়াল 'মিজি' মরে পড়ে আছে, পাশে পড়ে আছে লাল ড্রাগনটা। ড্রাগনটাকে আজ যেন আরো লাল দেখাচ্ছে। বিড়ালটার শরীর জুড়ে কোন হিংস্র জন্তুর নখের আঁচড়। মনটা বিষন্ন হয়ে গেল। আবার ভয়েরও উদ্রেক হল। রিস্ক নিলাম না, বিড়ালটাকে নিয়ে গেলাম আমার পরিচিত এক ফরেন্সিক এক্সপার্টের কাছে।
সন্ধ্যার সময় ফোন করলেন ভদ্রলোক। ফরেন্সিক রিপোর্ট শুনে আমার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল।
"বলেন কি ডাক্তার, ড্রাগ?"
ওপার হতে নিরুত্তাপ কন্ঠে জবাব এল, "হ্যাঁ ভাই, ড্রাগ। নখের আঁচড়ে নয়, ড্রাগের অভারডোজেই বিড়ালটার মৃত্যু হয়েছে। আর এটা সেই বিশেষ ড্রাগ যেটা তোমার কাজের মেয়ে তোমার খাবারে মেশাত।"
আমার হাত হতে রিসিভারটা খসে পড়ল। কি ষড়যন্ত্রের মধ্যে আমি পড়লাম ! আমার খাবারে ড্রাগ মিশিয়ে বা আমার পোষা বেড়ালটাকে ড্রাগের অভারডোজ দিয়ে মেরে কার কি লাভ ?
এর পর আরো একসপ্তাহ কেটে গেল। স্ফটিকের ড্রাগনটা বিড়ালটার কাছে কিভাবে এল সে ভাবনাকে মনে স্থান দিইনি। ড্রাগনটাকে আমি আমার খাটের পাশে টেবিলে রেখে দিয়েছিলাম। নাইটল্যাম্পের আলোয় অপূর্ব মোহময় দেখায় ওটাকে।
সেদিন রাতে একটা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম আমি তলিয়ে যাচ্ছি, অতল জলের গভীরে। একটু একটু করে কমে আসছে আলো। উহ্ কি কষ্ট ! চারিদিকে শুধু কালচে নীল রঙের জল.... কালো, আরও কালো হয়ে আসছে চারপাশটা। একটা সময় চারিদিক ছেয়ে গেল গভীর অন্ধকারে। বুকের উপরে যেন একটা দশমণ পাথর চেপে আছে,..... অসহ্য যন্ত্রণা !
হঠাৎ কালো জলের স্তর ভেদ করে একঝলক আলো ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে, আমি আস্তে আস্তে চোখ মেললাম। চোখ মেলে দেখি বিছানাতেই শুয়ে আছি, আর জানালা দিয়ে সকালের মিষ্টি রোদ আমার চোখে মুখে এসে পড়েছে।
এই একই স্বপ্ন দিন সাতেক দেখার পর আর চুপ করে বসে থাকা যায় না, অগত্যাই ছুটলাম মনোবিদের কাছে। ডাক্তারবাবু জানালেন যে সমস্যাটা এমন কিছু জটিল নয়। ওষুধপত্রও দিলেন। কিন্তু তাতে সমস্যা বাড়ল বই কমল না। এবার স্বপ্নের দৈর্ঘ্যটা বাড়ল। জলের অতলে তলিয়ে যাওয়ার পর একটা মন্দির দেখতে শুরু করলাম। জলের ভেতরে প্রাচীন একটা মন্দির, মন্দিরের সামনে দুটো বিশালাকায় ড্রাগন, ওদের চোখগুলো আগুনের ভাঁটার মতো জ্বলছে। তীব্র আগুনের হলকা ড্রাগনদুটোর মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে ক্রমাগত। সে কি দৃশ্য বিক্রমবাবু, না দেখলে বুঝতে পারবেন না। "
" তাহলে ড্রাগের অভারডোজে পোষা বিড়ালের মৃত্যু, ক্রমাগত দুঃস্বপ্ন, স্বপ্নে ড্রাগনের দর্শন, আর সর্বোপরি লাল ক্রিস্টাল ড্রাগন.... হুঁ, এই হল সমস্যা। কিন্তু আমি কি করতে পারি ? আমার মনে হয় মিঃ রায়চৌধুরী, আপনি ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট দেখান। " বিক্রম গম্ভীরভাবে বলল।
নেহান রায়চৌধুরী এবার ব্যাগ হতে দুটো বাণ্ডিল বের করে টেবিলে রাখল। "এতে দু' লক্ষ টাকা আছে, সমস্যার সমাধান করতে পারলে আরও দেব। আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই, আপনি ডিনাই করলে জাস্ট মরে যেতে হবে,.... আতঙ্কে শুকিয়ে শুকিয়ে মরে যেতে হবে। "
বিক্রম কিছু বলার আগেই অঘোরবাবু টাকাগুলো ছো মেরে তুলে নিয়ে বললেন, "আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, বিক্রমবাবু কেসটা নিলেন। " বিক্রম বিস্ময়ে হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো অঘোরবাবুর দিকে।
নেহানবাবু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বিক্রমের হাতে দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, কিন্তু হঠাৎ দরজার কাছ হতে ফিরে এলেন। এরপর ব্যাগ খুলে ক্রিস্টাল ড্রাগনটা টেবিলে নামিয়ে বললেন," এই আপদটা আপাতত আপনার কাছেই রাখুন। আমি একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই।" ড্রাগনটা রেখেই নেহানবাবু বেরিয়ে গেলেন।
নেহানবাবু বেরিয়ে যেতেই বিক্রম সোজা হয়ে বসল, তারপর হাঁক লাগাল, "মাধবদা, আরো একপ্রস্থ কফি আর বেগুনি আনো, অঘোরবাবুর ফের লটারি লেগেছে।"
অঘোরবাবু বিক্রমের সামনের চেয়ারটায় বসে একগাল হেসে বললেন," টাকা কি আর আমার মশাই, তবে আমি ইনেকটিভ থাকলে আপনি তো হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে দিতেন মশাই। আমাদের আর কিছু দরকার নেই, শুধু একটা পার্টি দিলেই হবে। " অঘোরবাবুর কথায় আমিও সন্মতি জানাই।
বিক্রম ড্রাগনটা নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, " হুমম ! সে নাহয় হলো, কিন্তু কেসটা হেব্বি জটিল। আমার কেন জানিনা মনে হচ্ছে অঘোরবাবুর ধারনাটাই ঠিক, - এই ড্রাগনের সঙ্গে তান্ত্রিক মোহাবেশের একটা সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। সায়ক, আজ রাত্রে তুমি আর অঘোরবাবু আমার ঘরে থাকবে। ড্রাগনটা তোমাদের বেডরুমে থাকবে। আমার উইলপাওয়ার খুবই বেশি, তাই এই ড্রাগনের এফেক্ট আমার উপরে পড়ার সম্ভাবনা কম। "
অঘোরবাবু মাথা নেড়ে সন্মতি জানালেন। ইতিমধ্যেই মাধবদা কফি নিয়ে হাজির। কফিতে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করে অঘোরবাবু বললেন," যাই বলো সায়ক, মাধবদা কফি বানায় দুর্দান্ত। আজ রাতে কষা কষা খাঁসির মাংস আর পরোটা । মাধবদা আলুপরোটাও খুব সুন্দর বানায়। আর হ্যাঁ, শশাঙ্কশেখরবাবুর ডায়েরিটা আমি এনে দিচ্ছি, বাকি অংশটা পড়ে ফেলতে পারবে।"
- - দুই--
সন্ধ্যাবেলায় আমি আর অঘোরবাবু বিক্রমের বাড়িতে এসে হাজির হলাম। কেসটা নিয়ে বহুক্ষণ আলোচনা চলল।
বিক্রম বলল," নেহানবাবুর কাগজপত্রগুলো দেখলাম। সর্বত্রই ড্রাগের ছড়াছড়ি। কিন্তু মোটিভ কি ? না সায়ক না, কিছু একটা গণ্ডগোল হচ্ছে। এমন কিছু আছে যা আমার দৃষ্টিকে ধোঁকা দিচ্ছে। কিন্তু সেটা কি ? আবার গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে দেবলীনার বাবা। কাগজপত্রগুলো মনযোগ দিয়ে স্টাডি করছি, ঠিক সেসময় উনার ফোন। "
অঘোরবাবু গর্জে উঠলেন," পাজীটা আবার কি বলছে মশাই ? ফোনটা দেন তো বিষ ঝেড়ে দিই ! "
বিক্রম বলল," শান্তি, শান্তি, শান্তি ! আগেরবার ভদ্রলোককে যা নয় তাই বলেছিলেন, হাজার হোক তিনি আমার হবু শ্বশুর। " অঘোরবাবু লাফিয়ে উঠলেন,"অমন হবু শ্বশুরের কাঁথায় আগুন মশাই ! আমি আপনাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখি মশাই, বিয়ে করলে আপনার বয়সিই ছেলে থাকত আমার, আপনার সঙ্গে কেউ খারাপ ব্যবহার করলে তাকে ছেড়ে কথা বলব না মশাই ! "
.... চলবে

0 Comments